
চায়ের দোকান থেকে নির্জন মোড়—মাদক কেনাবেচার অভিযোগ • যুবসমাজ নিয়ে উদ্বেগ • রাতেও জোরালো অভিযানের দাবি এলাকাবাসীর
জি. এম. ফিরোজ, ডুমুরিয়া: খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, চায়ের দোকান ও জনবিচ্ছিন্ন স্থানে তাসের জুয়া, গাঁজা ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের সেবন ও কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনের তুলনায় সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব তৎপরতা বেড়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল, সামাজিক পরিবেশ ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মাদকের বিস্তার রোধে এখনই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রুপরামপুর পশ্চিমপার, ১নং ধামালিয়া ইউনিয়নের চেচুড়ি, দুহাকুলা, চেচুড়ি বাজার,বরুনা বাজার ও ছায় বাড়িয়া মোড়, ধামালিয়া বাজার, থুকড়া বাজার ও আশপাশের গ্রাম, শাহপুর পাকার মাথা এবং গরু হাটের পাশে, আন্দুলিয়া টাওয়ার মোড় এবং মিকশিমিল বাজারের পানির ট্যাংকির মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে জুয়া ও মাদককেন্দ্রিক তৎপরতা রয়েছে। কোথাও চায়ের দোকানে তাস ও ক্যারম খেলার আড়ালে, আবার কোথাও নির্জন রাস্তা, গরুর হাট, রামকৃষ্ণ পুর শ্মশান ঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ-বারান্দায় মাদক সেবন ও কেনাবেচার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
মাদক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন থুকড়া বাজার বনিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ রমজান গাজী বলেন, “মাদক এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে, এখনই মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, তা না হলে যুবসমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে।” তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে থুকড়া এলাকায় মাদক সেবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁদের পরিবার এখন অসহায় অবস্থায় রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে জন্য মাদকের উৎস শনাক্ত ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
সোনামুখ স্মার্ট একাডেমির পরিচালক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এ এম কামরুল ইসলাম বলেন, “ভয়ানক মাদকের কারণে আজ যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। ডুমুরিয়া তথা বাংলাদেশকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে এখনই পুলিশের কঠোর অভিযান প্রয়োজন। এই মুহূর্তে মাদক নির্মূলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর জন্য অনেক বড় মূল্য দিতে হবে।”
শোলঘাতিয়া গ্রামের মোঃ কামরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, সন্ধ্যার পর শোলগাতিয়া ব্রিজের এপার-ওপার এবং আশপাশের কয়েকটি মোড়ে মাদককেন্দ্রিক তৎপরতার কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, এসব স্থানে দ্রুত নজরদারি বাড়িয়ে মাদকসংক্রান্ত তৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সন্ধ্যার পর নিরাপদে চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, রংপুর ও শলুয়ার কয়েকটি মোড়ে ব্যক্তিগত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে কেউ কেউ প্রশাসনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, অভিযানের খবর পেলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক হয়ে যান। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। মাদক বিক্রির মাধ্যমে কেউ কেউ সম্পদ গড়েছেন বলেও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও তদন্ত ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
থুকড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, কিছুদিন আগে অ্যালকোহল পান করার পর পরপর দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের প্রশ্ন, ওই পানীয় কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কে সরবরাহ করেছিল এবং ঘটনার পর কী ধরনের তদন্ত হয়েছে। এ বিষয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসা বা ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য এবং পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদক ও অবৈধ পানীয়ের উৎস শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় চলাচল নিয়ে ভয় ও অস্বস্তির কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান অনেক সময় ভোরে পরিচালিত হলেও মাদক কেনাবেচার তৎপরতা বেশি দেখা যায় সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। এ কারণে সময়ভিত্তিক নজরদারি, নিয়মিত টহল, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান এবং স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক জাহানারা খাতুন ও মো. আব্দুল হালিম সরদারের নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় থানা-পুলিশ আরও তৎপর হলে মাদক নির্মূলে অগ্রগতি সম্ভব বলেও জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়—মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ধারাবাহিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বাজার, স্কুল-মাঠ, শ্মশান ও জনসমাগমস্থলে নজরদারি বাড়ানো এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও জুয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সন্ধ্যা ও রাতে কার্যকর নজরদারি এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগে মাদকমুক্ত, নিরাপদ পরিবেশ ফিরবে এবং যুবসমাজ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
Leave a Reply