
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : শীতকালের ব্যাপ্তি ক্রমেই কমে আসছে। কমপক্ষে দুই মাস তীব্র শীতে জবুথবু গোটা দেশের চিত্র এখন অতীত। গত কয়েক বছর হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে হাতে গোনা কয়েক দিন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দেশের শীত ঋতুর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্ব ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছর পর (৭০ সাল নাগাদ) এই অঞ্চলের প্রকৃতি থেকে শীত ঋতু উধাও হয়ে যাবে। আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই শীত ঋতুর ব্যাপ্তি কমে আসছে। এই ঋতুতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ থেকে ১শ’ ভাগ পর্যন্ত কম হচ্ছে। গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে। ২০৩০ সালেতাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত দেখা দেবে শীতের মাসগুলোতে। ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ আইপিসিসি বা জলবাযু বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করছে। প্রায় সব ঋতুতে এর প্রভাব পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এই বিজ্ঞানী প্যানেল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, মানুষের নানা কর্মকা-ের পরিণতিতে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। বরফ গলা পানি গিয়ে পড়ছে সাগরে। আইপিসিসির নতুন এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাগরে তাপ বাড়ার ফলে আবহাওয়া দিনকে দিন বিপজ্জনক আচরণ করবে। সামুদ্রিক ঝড় বেশি হবে, জলোচ্ছ্বাস বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে গ্লোবাল কমিশন অন এ্যাডাপটেশন (জিসিএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। জলবায়ুর চরমভাবাপন্ন বৈরী আচরণ আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আবহাওয়া অফিসের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতকালে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বাড়ছে। শীতকালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে) যেখানে স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫.৪ ও ২৬.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪.২ ও ১২.৪ ডিগ্রী। দেখা গেছে, এই তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব বাংলাদেশে শীতের ওপর পড়ছে। ফলে শীতকালের ব্যাপ্তি কমছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে পৌষ-মাঘ এই দুই মাসকে শীত ঋতু ধরা হলেও ঋতু বৈচিত্র্যের ধরন অনুযায়ী প্রকৃতিতে অনেক আগেই শীতের আনাগোনা শুরু হয়। শীতের এই বৈশিষ্ট্যে এখন আর নেই। ভরা মৌসুমেও শীতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তারা জানান, শীতকালে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে শীতের ফসল উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তারা বলেন, আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তনকে কখনও উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর বৃষ্টিপাত, কখনও অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ঋতুভিত্তিক ভিন্নতা ইত্যাদি বিষয় দ্বারা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত শীতের মাসগুলোতেই বেশি পরিলক্ষিত হবে। আগামীতে শীত শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হবে। এ ঋতুতে বৃষ্টিপাত প্রায়ই হবে না। উষ্ণতা বাড়বে, দেখা দেবে খরা। শীতের মাত্রাও আস্তে আস্তে কমে আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীতকালেই বেশি স্পষ্ট হবে। সম্প্রতি হিসেবেও শীতকালে এই প্রভাবটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর এই মৌসুম প্রায় বৃষ্টিপাতহীন থাকছে। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদফতরের হিসেবে দেখা গেছে, স্বাভাবিকের চেয়ে শীতে বৃষ্টিপাত প্রায় ১শ’ শতাংশ কম হচ্ছে। আগামীতে এই প্রভাবটা আরও বাড়তে পারে। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের একই প্রভাব বিরাজ করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশ সেন্টার ফর এ্যাডভান্স স্টাডিজ পরিচালিত এক সমীক্ষায় তুলে ধরা হয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের হার মাঝামাঝি হলেও ২০৭৫ সালে হার দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা পরিবর্তনের হার অনেক বেড়ে যাবে। ২০৩০ সালে তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত দেখা দেবে শীতের মাসগুলোতে। যদিও শীত পরবর্তী মাসগুলোতে (এপ্রিল, মে ও জুনে) বেশিরভাগ পরিবর্তন দেখা দেবে। ২০৭৫ সালের এপ্রিল-মে মাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বেশি হবে। প্রায় ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এ গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৭০ সালের শীত, গ্রীষ্ম ঋতুতে বাষ্পীভবনের অনেক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এ পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হবে। যার ফলে ব্যাপক বন্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় হবেই না। ফলে শীতকাল শুষ্ক ও খরা মৌসুমে পরিণত হবে। অবশ্য এতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমার হার হবে নগণ্য। কিন্তু ২০৭৫ সালে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় হবেই না। এতে বলা হয় বাংলাদেশের জলবায়ুকে এর উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর বৃষ্টিপাত, কখনও অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ঋতুভিত্তিক ভিন্নতা ইত্যাদি বিষয় দ্বার সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব। যদিও দেশটির বেশিরভাগ অংশ উত্তরক্রান্তি রেখায় অবস্থিত। তারপর হিমালয় পর্বতের প্রভাবে বাংলাদেশের জলবায়ু পুরো বছর ধরেই কম বেশি উষ্ণ থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু সাধারণত নিয়ন্ত্রিত হয় গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বায়ু দ্বারা। উষ্ণ, আর্দ্র এবং অস্থিতিশীল বাতাস বহনকারী দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু উৎপন্ন হয় ভারতীয় মহাসাগর থেকে। শীতল বাতাস সমৃদ্ধ উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু আসে সাইবেরিয়ান মরুভূমি থেকে। যা সাধারণত ঝড়ো হাওয়া ও শীতের সময় প্রবাহিত হয়। এ কারণে পুরো দেশজুড়ে সাধারণ আর্দ্র, উষ্ণ এবং গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ু দ্বারা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন কর্মকা-ের ফলে জলবায়ুতে যে পরিবর্তন সাধিত হয় তার অন্যতম ভুক্তভোগী হচ্ছে বাংলাদেশ। আবার বাংলাদেশ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম। অর্থনৈতিক উন্নয়নের তালিকায় সব পরিমাপের দিক দিয়ে নিম্ন। এ কারণেই দেশের মানুষ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খুবই বিপদাপন্ন। দেশের মাত্র ২০ ভাগ জিডিপি আসে কৃষি থেকে। কিন্তু ৬০ ভাগ মানুষ কৃষি থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ঋতু বৈচিত্র্যের পরিবর্তনের ফলে কৃষি, উপকূলীয় অঞ্চল, পানি সম্পদ, বনাঞ্চল, মৎস্য, স্বাস্থ্য এবং জ্বালানি খাত বেশি বিপন্নতার মধ্যে পড়তে পারে। তাদের মতে, এ সমস্যা মোকাবেলা ও ঝুঁকি কমাতে সরকারী-বেসরকারী ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন প্রতিবছর অনাবৃষ্টি, খরা, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে ৯ থেকে ১০ মাসই দেশের সব নদী-খাল-বিল শুষ্ক থাকছে। কৃষি কাজের জন্য এ সময় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ভূগর্ভস্থের পানিও দিন দিন নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম ছাড়াও দেশের বেশিরভাগ নদ-নদীও শুকিয়ে খালে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময় বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও বিগত কয়েক বছরের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে সেই পরিচিত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২.৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ৩০ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় (রাজশাহীতে) ৪৫.১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এরপর ১৯৯৫ সালে এসে রেকর্ড হয় ৪৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল ৪২.২ ডিগ্রী সেলসিয়াস (যশোরে)। যা ছিল বিগত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রার এই রেকর্ডে যদিও মনে হচ্ছে তাপমাত্রা কমছে। কিন্তু অতীতে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রার পরিমাণ ছিল কম। বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রার পরিমাণ অনেক বেশি। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে শুধু ঢাকা শহরের মে মাসের গড় তাপমাত্রা ১৯৯৫ সালের তুলনায় বেড়েছে ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস। নবেম্বর মাসে এই তাপমাত্রা ১৪ বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ০.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাবে দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার শতকরা ০.৫। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রার গড় ১.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং ২১শ’ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রকৃতি থেকে শীত ঋতু উধাও হয়ে যাবে।দিন দিন বিশ্ব ক্রমশ হয়ে উঠছে। মূলত জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণেই এমনটা হচ্ছে। এসব প্রভাবের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে দেশের শীত ঋতুর উপর। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বিশ্ব উষ্ণায়নের এই ধারা ক্রমশ অব্যাহত থাকে তাহলে আগামী ৫০ বছর পর এই অঞ্চলের প্রকৃতি থেকে উধাও হয়ে যাবে শীত।
আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই শীত ঋতুর ব্যাপ্তি কমে আসছে। এই ঋতুতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ থেকে ১শ’ভাগ পর্যন্ত কম হচ্ছে। গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে। ২০৩০ সালে তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত দেখা দেবে শীতের মাসগুলোতে।
ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ আইপিসিসি বা জলবাযু বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরইমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করছে। প্রায় সব ঋতুতে এর প্রভাব পাওয়া যাচ্ছে।
জাতিসংঘের এই বিজ্ঞানী প্যানেল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, মানুষের নানা কর্মকান্ডের পরিণতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। বরফ গলা পানি গিয়ে পড়ছে সাগরে।
আইপিসিসির নতুন এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাগরে তাপ বাড়ার ফলে আবহাওয়া দিনকে দিন বিপজ্জনক আচরণ করবে। সামুদ্রিক ঝড় বেশি হবে, জলোচ্ছ্বাস বাড়বে।
আবহাওয়া অফিসের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতকালে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বাড়ছে। শীতকালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে) যেখানে স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫.৪ ও ২৬.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪.২ ও ১২.৪ ডিগ্রী। দেখা গেছে, এই তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব বাংলাদেশে শীতের ওপর পড়ছে। ফলে শীতকালের ব্যাপ্তি কমছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে পৌষ-মাঘ এই দুই মাসকে শীত ঋতু ধরা হলেও ঋতু বৈচিত্র্যের ধরণ অনুযায়ী প্রকৃতিতে অনেক আগেই শীতের আনাগোনা শুরু হয়। শীতের এই বৈশিষ্ট্যে এখন আর নেই। ভরা মৌসুমেও শীতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। শীতকালে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে শীতের ফসল উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তনকে কখনও উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর বৃষ্টিপাত, কখনও অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ঋতুভিত্তিক ভিন্নতা ইত্যাদি বিষয় দ্বারা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত শীতের মাসগুলোতেই বেশি পরিলক্ষিত হবে। আগামীতে শীত শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হবে। এ ঋতুতে বৃষ্টিপাত প্রায়ই হবে না। উষ্ণতা বাড়বে, দেখা দেবে খরা। শীতের মাত্রাও আস্তে আস্তে কমে আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীতকালেই বেশি স্পষ্ট হবে।
গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৭০ সালের শীত, গ্রীষ্ম ঋতুতে বাষ্পীভবনের অনেক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, এ পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হবে। যার ফলে ব্যাপক বন্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় হবেই না। ফলে শীতকাল শুষ্ক ও খরা মৌসুমে পরিণত হবে।
অবশ্য এতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমার হার হবে নগণ্য। কিন্তু ২০৭৫ সালে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় হবেই না।
আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাবে দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার শতকরা ০.৫। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রার গড় ১.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং ২১শ’ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়বে। তাপমাত্রা বাড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রকৃতি থেকে শীত ঋতু উধাও হয়ে যাবে।শতাব্দীর শেষ নাগাদ হয়ত পৌষের কুয়াশা আর থাকবে না। মাঘ মাসেও দিব্বি হাফ শার্ট পরেই ঘুরে বেড়ানো যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তখন শীত আর থাকবেই না।
গড় তাপমাত্রা সাড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর সেই সঙ্গে সমুদ্রের পানি বাড়তে বাড়তে ডুবিয়ে দেবে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিলীন হয়ে যেতে পারে দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ।
২০৫০ সালের মধ্যে বন্যায় ঘরবাড়ি হারাতে পারেন প্রায় ৯ লাখ মানুষ।
‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শীর্ষক নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের জলবায়ু সংকট নিয়ে গভীর এসব উদ্বেগ জানানো হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এই প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে। যেখানে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে সেভ দ্য চিলড্রেন।
এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ। সহ-লেখক ছিলেন কাইসা পার্ডিং, হ্যান্স ওলাভ হাইজেন, আফরোজা সুলতানা, ইয়ান ইভেন ওয়ে নিলসেন ও এস এম কামরুল হাসান।
এ বিষয়ে বজলুর রশিদ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ২০১১ সাল থেকে কাজ করছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট। এটি তাদের তৃতীয় প্রতিবেদন, যেখানে পাঁচ ধরনের জলবায়ু পরিস্থিতির বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে শতাব্দীর বাকি সময়কে দুটি ভাগে (২০৪১-২০৭০ সাল) ও (২০৭১-২১০০ সাল) ভাগ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে কী-নোট উপস্থাপন করেন নরওয়ের আবহাওয়াবিদ হ্যান্স ওলাভ হাইজেন। পরে প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ।
এ বিষয়ে হ্যান্স ওলাভ হাইজেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু সম্পর্কে পূর্বাভাস প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে আমরা কিছু অন্ধকার দিক দেখতে পেলেও প্রতিবেদনের ভালো দিকটি হলো, বাংলাদেশের জন্য সমস্যা সৃষ্টির আগেই পদক্ষেপ নিতে এবং জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে লেখালেখির দ্বার উন্মোচন করেছে।’
বজলুর রশিদ বলেন, ‘এটি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু নিয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রজেকশন রিপোর্ট। এটা ভালো লক্ষণ যে, প্রতিবেদনটিতে শুধু প্রক্ষেপণই নয়, সারমর্মও তুলে ধরা হয়েছে, যে তীব্র তাপপ্রবাহ, কম শীত বা চরম আবহাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন খাতে আমাদের কী করা প্রয়োজন, বিশেষ করে বিভিন্ন সেক্টরের নীতিনির্ধারক বা পরিকল্পনাবিদদের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।’
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে দেশের তাপপ্রবাহ আরও বেড়ে যাবে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় সারা বছরই তীব্র গরম থাকতে পারে।
যদি গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো না যায়, তাহলে ২০৪১-২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে যা বেড়ে ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত হতে পারে।
এতে জানানো হয়, বর্ষার আগের (মার্চ-মে) সময়টিতে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। ২০৭০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষার আগে ২০ দিন পর্যন্ত তাপপ্রবাহ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। বর্ষা মৌসুমেও তাপপ্রবাহ বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১০০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগের ৯০ দিনের মধ্যে ৭০ দিনই তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে অন্তত দুটি প্রবল তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারেন নগরবাসীরা। একটি বর্ষার আগে, আরেকটি বর্ষার পরে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চল থেকে শীতের আবহও সরে যাবে। শতাব্দীর শেষদিকে শীত মৌসুম প্রায় নাই হয়ে যেতে পারে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ মাত্র এক-দুদিন অনুভূত হতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, বেশিরভাগ সময় দেশের উত্তর, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।
ভবিষ্যতে বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা অনেক বেশি। নতুন পূর্বাভাস বলছে, ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষায় মোট বৃষ্টিপাত গড়ে ১১৮ মিলিমিটার বেড়ে যেতে পারে, আর শতাব্দীর শেষে এই হার গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে ২৫৫ মিলিমিটারে উন্নীত হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টি বাড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এই অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা ও ভূমিধস বাড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, পৃথিবী গরম হওয়ায় সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে এবং বরফ গলে পানি বাড়ে। এর ফলে বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকায় বন্যা বাড়বে।
এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর ৩ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাবে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ২ দশমিক ১ মিলিমিটার।
এই বৃদ্ধির ফলে স্থায়ী উপকূলীয় প্লাবনের সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের এই তীব্র বৃদ্ধির ফলে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ৯১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা (২৩ শতাংশ) প্লাবিত হতে পারে।
এ কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারাতে পারেন বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশি গরমে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তীব্র গরমে শ্রমিকদের কাজ করা কঠিন হবে এবং তাদের স্বাস্থ্য-ঝুঁকি বাড়বে। এমনকি সমুদ্রের পানি বাড়লে লবণাক্ততা বাড়বে, ফলে ফসল, মাছ ধরা ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন আবহাওয়াবিদ
গবেষকরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন একদিনে থামানো যাবে না, এমনকি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমালেও কিছু পরিবর্তন হবে। কিন্তু গ্যাস ও দূষণ কমানো না গেলে ভবিষ্যতের ক্ষতি হবে ভয়াবহ।
এজন্য তারা দুইভাবে কাজের সুপারিশ করেছেন, যেমন: প্রশমন বা দূষণ কমানো এবং অভিযোজন বা ক্ষতি ক্ষমাতে প্রস্তুতি নেওয়া (বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার)।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের গতি দ্রুততর হচ্ছে এবং আমাদের গ্রহের উষ্ণায়ন এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ উষ্ণ বছরগুলোর একটি এবং অক্টোবর ২০২৫ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ইতিহাসের সর্বাধিক উষ্ণ অক্টোবরগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।’
‘বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে মধ্য-শতাব্দীতে ১–২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শতাব্দীর শেষে ১ দশমিক ৫–৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসবে এবং বর্ষায় বৃষ্টিপাত ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে—বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে’, বলেন তিনি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যানের (এনএপি) মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, টেকসই নগরায়ন এবং প্রকৃতি-নির্ভর সমাধানসহ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক জলবায়ু প্রক্ষেপণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’
অনুষ্ঠানে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হ্যাকন অ্যারাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন বলেন, ‘এই রিপোর্টে বাংলাদেশের জলবায়ু প্রক্ষেপণ খুবই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উপকূলীয় মানুষকে হুমকিতে ফেলবে, আর তীব্র হিটওয়েভ স্বাস্থ্য, কৃষি ও নিরাপদ পানির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। এগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।’
বাংলাদেশ, বিএমডি এবং জাতীয় অংশীদারদের জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে সহযোগিতা করা নরওয়ে সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে বলেও জানান তিনি।
বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি দৃঢ় ও সহনশীল দেশ এবং এই প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পদক্ষেপে ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি অপরিহার্য। সামনে নির্বাচন এবং আমি আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো এসব প্রক্ষেপণ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেবে।’
এ সম্পর্কে সেভ দ্য চিলড্রেন জানায়, প্রতিবেদনটি জাতীয় পরিকল্পনা, অভিযোজন কৌশল এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমে ব্যবহারযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে।
তারা আরও জানায়, ভবিষ্যৎ জলবায়ু প্রক্ষেপণকে অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন, কমিউনিটি প্রস্তুতি এবং শিশু-কেন্দ্রিক জলবায়ু সহনশীলতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্ব ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে। আর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে দেশের শীত ঋতুর ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছর পর এই অঞ্চলের প্রকৃতি থেকে শীত ঋতু উধাও হয়ে যাবে।
আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমেই শীত ঋতুর ব্যাপ্তি কমে আসছে। এই ঋতুতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ থেকে ১শ’ভাগ পর্যন্ত কম হচ্ছে। গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়ছে। ২০৩০ সালে তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত দেখা দেবে শীতের মাসগুলোতে।
ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ আইপিসিসি বা জলবাযু বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে। এরইমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করছে। প্রায় সব ঋতুতে এর প্রভাব পাওয়া যাচ্ছে।
জাতিসংঘের এই বিজ্ঞানী প্যানেল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, মানুষের নানা কর্মকান্ডের পরিণতিতে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন দ্রুত হারে সাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং বরফ গলছে। বরফ গলা পানি গিয়ে পড়ছে সাগরে।
আইপিসিসির নতুন এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাগরে তাপ বাড়ার ফলে আবহাওয়া দিনকে দিন বিপজ্জনক আচরণ করবে। সামুদ্রিক ঝড় বেশি হবে, জলোচ্ছ্বাস বাড়বে।
আবহাওয়া অফিসের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতকালে স্বাভাবিক তাপমাত্রা বাড়ছে। শীতকালে (ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে) যেখানে স্বাভাবিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫.৪ ও ২৬.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪.২ ও ১২.৪ ডিগ্রী। দেখা গেছে, এই তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব বাংলাদেশে শীতের ওপর পড়ছে। ফলে শীতকালের ব্যাপ্তি কমছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে পৌষ-মাঘ এই দুই মাসকে শীত ঋতু ধরা হলেও ঋতু বৈচিত্র্যের ধরণ অনুযায়ী প্রকৃতিতে অনেক আগেই শীতের আনাগোনা শুরু হয়। শীতের এই বৈশিষ্ট্যে এখন আর নেই। ভরা মৌসুমেও শীতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। শীতকালে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে শীতের ফসল উৎপাদনের ওপর এর প্রভাব পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আগামীতে জলবায়ু পরিবর্তনকে কখনও উচ্চ তাপমাত্রা, প্রচুর বৃষ্টিপাত, কখনও অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং ঋতুভিত্তিক ভিন্নতা ইত্যাদি বিষয় দ্বারা সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রধানত শীতের মাসগুলোতেই বেশি পরিলক্ষিত হবে। আগামীতে শীত শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হবে। এ ঋতুতে বৃষ্টিপাত প্রায়ই হবে না। উষ্ণতা বাড়বে, দেখা দেবে খরা। শীতের মাত্রাও আস্তে আস্তে কমে আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শীতকালেই বেশি স্পষ্ট হবে।
গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৭০ সালের শীত, গ্রীষ্ম ঋতুতে বাষ্পীভবনের অনেক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, এ পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হবে। যার ফলে ব্যাপক বন্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় হবেই না।
ফলে শীতকাল শুষ্ক ও খরা মৌসুমে পরিণত ২০৩০ সালের শীতকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমার হার হবে নগণ্য। কিন্তু ২০৭৫ সালে শীতকালে বৃষ্টিপাত প্রায় হবেই না।
আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাবে দেখা গেছে, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার শতকরা ০.৫। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রার গড় ১.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়বে।
Leave a Reply