
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় আপাদান রেখেছেন সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। এই সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ আহরণ করে দেশের প্রায় অর্ধ কোটি মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে বড় অবদান এই অবদান টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসতে হবে মৎস্যজীবী সহ সর্বস্তরের মানুষের।নদীমাতৃক। এ দেশ বিশাল জলসম্পদে সমৃদ্ধ। সারাদেশ জুড়ে রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও পুকুর। তার দক্ষিণে অন্তহীন সমুদ্র। মৎস্য উৎপাদনের বিস্তৃত ক্ষেত্র পড়ে আছে এ দেশের সর্বত্র। তাতে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ। এ সব মাছ সুস্বাদু ও সহজপাচ্য। মাছ তাই বাঙালিদের কাছে অতি প্রিয়। মাছ আর ভাত ছাড়া বাঙালির খাবার মনঃপূত হয় না। তার তৃপ্তি মেটে না। বাঙালির খাদ্যে মাছ এবং ভাতেরই প্রাধান্য। অনাদিকাল থেকে মাছ এবং ভাতের উপর বাঙালিদের নির্ভরতার কারণে এ দেশের মানুষের পরিচয় হয়েছে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’।
জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থুল জাতীয় উৎপাদনে এ খাতের অবদান শতকরা প্রায় ৪ ভাগ এবং কৃষির উৎপাদনে শতকরা ২১ ভাগ। জাতীয় রফতানি আয়ে মৎস্য খাতের শরিকানা শতকরা প্রায় ৪ ভাগ। আমাদের নিত্যদিনের খাদ্য তালিকায় প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৫৮ ভাগ সরবরাহ আসে মাছ থেকে। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডে প্রায় ১৩ লাখ শ্রমিক সার্বক্ষণিকভাবে এবং ১ কোটি ২৫ লাখ শ্রমিক খন্ডকালীনভাবে নিয়োজিত আছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, কর্মসংস্থানে, দারিদ্র্য মোচনে এবং প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি দূরীকরণে মৎস্য খাতের উন্নয়ন নিতান্ত অপরিহার্য।
বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্রকে প্রধানত অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে মুক্ত জলাশয় ও বদ্ধ জলাশয়। মুক্ত জলাশয়ের মধ্যে আছে প্লাবন ভূমি, নদী, বিল, কাপ্তাই হ্রদ ও সুন্দরবন। এর আয়তন ৪০.৪৭ লাখ হেক্টর, যা মোট অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের শতকরা ৮৮.৪৬ ভাগ। বদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে আছে পুকুর, মরা নদীর অংশ বা বাঁওড় ও উপকূলীয় চিংড়ি খামার। এর আয়তন ৫.২৮ লাখ হেক্টর, যা মোট অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের ১১.৫৪ শতাংশ। আমাদের সমুদ্র তটরেখা ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ। অর্থনৈতিক এলাকা ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। মোট সামুদ্রিক জলসম্পদের আয়তন ১৬৬ লাখ হেক্টর, যা দেশের মোট জলসম্পদের ৭৮.৩৯ শতাংশ।
জলাশয়গুলো ঋতু, আবহাওয়া, জলবায়ু ও অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে অহরহই আকৃতি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু বছর ভিত্তিক প্রদত্ত পরিসংখ্যানে তার তেমন প্রতিফলন ঘটছে না। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে জলাশয়ের পরিমাণ হালনাগাদ করা উচিত।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ২৬০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, ২৪ প্রজাতির মিঠা পানির চিংড়ি এবং ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছ রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রজাতির মিঠা পানির মাছ ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের সামুদ্রিক এলাকায় রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, যার মধ্যে কেবল ৬৫ প্রজাতির মাছ আহরণযোগ্য। তাছাড়া আছে ৩৬ প্রজাতির সামুদ্রিক চিংড়ি, ৩ প্রজাতির লবস্টার, ২৫ প্রজাতির কাছিম ও ১১ প্রজাতির কাঁকড়া। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক জলাশয় মৎস্য সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এর জীব-বৈচিত্র্য অত্যন্ত বিস্তৃত। তবে এর উৎপাদন ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
এ দেশে মাছের বার্ষিক উৎপাদন ২৫.৬৩ লাখ মেট্রিক টন (২০০৭-২০০৮ সালের তথ্য অনুসারে)। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আহরিত মাছের পরিমাণ ৮০.৫৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক জলসম্পদ থেকে প্রাপ্ত মাছের হিস্যা ১৯.৪১ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগৃহীত মাছের শতকরা ৪১.৩৬ ভাগ সরবরাহ আসে মুক্ত জলাশয় থেকে এবং ৩৯.২৩ ভাগ আসে বদ্ধ জলাশয় থেকে। সামুদ্রিক মৎস্যের শতকরা ৯৩.১৩ ভাগ যোগান আসে আর্টিশনাল বা চিরায়ত আহরণ পদ্ধতির মাধ্যমে, আর বাকি ৬.৮৭ শতাংশ আসে ট্রলার কেন্দ্রিক শিল্পায়িত আহরণের মাধ্যমে। বছরের পর বছর সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের হিস্যা হ্রাস পেয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ আহরণের হিস্যা বেড়েছে। এর কারণ সামুদ্রিক আহরণের প্রবৃদ্ধির হার কম, অভ্যন্তরীণ আহরণের প্রবৃদ্ধির হার বেশি। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে বদ্ধ জলাশয় তথা চাষাধীন জলাশয় থেকে আহরণের প্রবৃদ্ধির হার বেশি বিধায় মোট মৎস্য উৎপাদনে এ হিসস্যা দ্রুত বেড়েছে। গত দশকে (১৯৯৮-৯৯ থেকে ২০০৭-০৮) অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়, বদ্ধ জলাশয় এবং সামুদ্রিক জলসম্পদ থেকে মৎস্য আহরণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে শতকরা ৫.৪৪, ৫.৮৬ এবং ৫.২৬ ভাগ। এ সময় মাছের মোট উৎপাদন বেড়েছে বার্ষিক শতকরা ৫.৫৭ শতাংশ হারে (সারণি ১)।
অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ের মৎস্য উৎপাদনে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্যে। এর পেছনে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মৎস্য অধিদপ্তরের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে বাংলাদেশের বদ্ধ জলাশয়ে হেক্টর প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ২.৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। এই উৎপাদন সহজেই ৪.০ মেট্রিক টনে উন্নীত করা সম্ভব। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনের ধীর গতির পেছনে রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ। তদুপরি বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে মৎস্য প্রজনন, বিচরণ ও জীবনচক্রের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অধিকন্ত প্লাবন ভূমি হ্রাস পাওয়ার কারণে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মাছের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে না। এ উৎস্য থেকে মাছের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্প্রতি মুক্ত জলাশয়ে মাছের পোনা মজুদ করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হচ্ছে। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, সংরক্ষণ ও ভরাট হয়ে যাওয়া নদী পুনঃ খনন করে মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন করা দরকার। তাছাড়া মুক্ত জলমহালে জৈবিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট জলমহালগুলো মৎস্য ও পশু সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা উচিত।
অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান উপায় হলো উন্নত পদ্ধতিতে মাছের চাষ। এর জন্য কাঙ্ক্ষিত জাতের গুণগত মান সম্পন্ন পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছয় শতাধিক হ্যাচারী স্থাপিত হয়েছে ব্যক্তি মালিকানায়। এদের মান নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত দরকার। তাছাড়া বিদেশ থেকে যেন থাই মাগুর ও পিরানহা ধরনের রাক্ষুসে মাছ এদেশে প্রবেশ করতে না পারে এবং আমাদের জলাশয়ে ছড়াতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইলিশ মাছ দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের শতকরা ১২ ভাগ অংশ দখল করে আছে। কিন্তু নির্বিচারে মা মাছ এবং জাটকা আহরণ ও নিধনের ফলে এর উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সে কারণে মৎস্য সংরক্ষণ আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, ইলিশের অভয়াশ্রম নির্ধারণ ও তা কার্যকরকরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা ও জাটকা নিধন বন্ধকরণ কর্মসূচিকে জোরদার করতে হবে। ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মা মাছ নিধন ও জাটকা মাছ আহরণে নিয়োজিত মৎস্যজীবীদের প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা প্রদান ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও একান্ত দরকার।
মাছের মজুদ কমে আসা সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ হ্রাস পাবার প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করেন। তবে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের প্রকৃত পরিসংখ্যান নিয়েও অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন। তাদের মতে প্রদত্ত পরিসংখ্যান থেকে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ অনেক বেশি হবে। চিরায়ত ও শিল্পায়িত আহরণ সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য পাওয়া না গেলে এতদসংক্রান্ত দ্বিমতের অবসান হবে না। এ লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তাছাড়া সামুদ্রিক মৎস্য মজুদের পরিমাণ এবং বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের গতিবিধি জানার জন্যে নিয়মিত জরিপ চালানো প্রয়োজন। তাতে সহনীয় মাত্রায় মৎস্য আহরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলো উপকূলের কাছাকাছি থেকে বেশিরভাগ মাছ আহরণে নিয়োজিত। গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরার ব্যবস্থা জোরদার করা হলে মাছের মোট আহরণ বৃদ্ধি পাবে। উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ ও চিংড়ির পোনা ধরার সময় বহু সংখ্যক অন্যান্য প্রজাতির মাছের পোনা ও জলজ প্রাণী ধ্বংস করা হয়। তাতে সামুদ্রিক মাছের মজুদ হ্রাস পায়। এ অবস্থার উন্নতিকল্পে উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ ও চিংড়ির পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কাজে নিয়োজিত লোকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রণীত আইনের বাস্তবায়ন সম্ভব।
১৯৯২-৯৩ সালে মোট রফতানি বাণিজ্যে মাছের শরিকানা ৭.৫৭ শতাংশ থেকে ২০০৭-০৮ সালে হ্রাস পেয়েছে ৪.৪ শতাংশে। কিন্তু মাছ রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ২৬,৬০৭ মেট্রিক টন থেকে ৭৫,২৯৯ মেট্রিক টনে। আয় বেড়েছে ৭০০.২৯ কোটি থেকে ৩৩৯৬.২৮ কোটি টাকায়। এ সময় মাছের মোট রফতানি আয়ে চিংড়ির শরিকানা কমেছে শতকরা ৮৬.২৫ ভাগ থেকে ৮৪.৩২ ভাগে। অপরদিকে হিমায়িত মাছের হিস্স্যা বেড়েছে। আমাদের রফতানি বাণিজ্যে চিংড়ি একটি বড় এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে। বর্তমানে রফতানিকৃত চিংড়ির শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ বাগদা এবং ২০ ভাগ গলদা চিংড়ি। জানা যায়, চিংড়ি রফতানিকারক কোন কোন ব্যবসায়ী চিংড়িতে পেরেক ঢুকিয়ে দেয় ওজন বৃদ্ধির জন্য। তাছাড়া ক্ষতিকারক এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে চিংড়ি খামারে। তাতে আমাদের রফতানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।
সারণি ১ বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরণের জলাশয়ের আয়তন ও মৎস্য উৎপাদন (২০০৭-০৮)।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি চিংড়ির বৃদ্ধির সঙ্গে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সাতক্ষীরায় গড়ে উঠেছে শতাধিক মৎস্য ও চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। সাম্প্রতিককালে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, এ শিল্পগুলোর প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতার শতকরা মাত্র প্রায় ৪০ ভাগ ক্ষমতা প্রকৃত পক্ষে ব্যবহূত হচ্ছে। কাঁচামালের অভাবে শিল্পগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। নিবিড় চাষাবাদের মাধ্যমে চিংড়ির প্রতি একক উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো গেলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে। সম্প্রসারিত চিংড়ির চাষ লাভজনক প্রতীয়মান হলেও উপকূলীয় এলাকায় এ কারণে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই স্বাদু পানির চিংড়ি চাষ এলাকা বৃদ্ধির জন্য এখন বেশি করে উদ্যোগ নেয়া উচিত।
মাছ একটি পচনশীল পণ্য। আহরণের পরই এর বাজারজাত করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশের অনুন্নত অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার কারণে মাছের বাজার দক্ষ নয়। তাছাড়া বরফ দেয়া, প্রক্রিয়াজাত করা, ক্রমানুসারে সাজানো, হিমায়িত করা ইত্যাদি কাজগুলো সঠিকভাবে করা হয় না বলে ভোক্তার নিকট অনেক সময় গ্রহণযোগ্য অবয়বে মাছ পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় না। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, আহরণ থেকে ভোক্তার নিকট পেঁছে দেয়া পর্যন্ত শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ মাছ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাছের বিপণন খরচ বেড়ে যায়। এক হিসেব মতে মাছের বিপণন খরচ ও মুনাফা ভোক্তা প্রদত্ত মূল্যের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ। এটি বিপণন অদক্ষতারই পরিচায়ক। তাছাড়া মাছ আহরণের কাজটি এলাকা ও মৌসুম নির্ভর বিধায় স্থান ও কালভেদে মাছের মূল্যে বিরাট ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। সময় ভেদে এ ব্যবধান শতকরা ৫৪ থেকে ৪৪৯ ভাগ এবং স্থান ভেদে ১৫ থেকে ৫৪ ভাগ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। মাছ হিমায়িতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবহন ব্যবস্থার যথাযথ উন্নয়নের মাধ্যমে এ অসুবিধাগুলো ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা সম্ভব।
মাছের বড় বাজারগুলো সাধারণত মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক বৃহৎ ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের হাতে জব্দ থাকে। তারা দাদন দিয়ে করায়ত্ত করে রাখে ছোট ব্যবসায়ী ও জেলেদের। ওদের মাধ্যমেই মাছের সরবরাহ নিশ্চিত রাখে বড় ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার অভাব থাকে। সে কারণে মাছের ব্যবসা বরাবরই বিক্রেতা শাসিত হয়, ক্রেতা শাসিত নয়। একই কারণে মাছের ব্যবসায়ীরা বিপণনের মান উন্নয়নকল্পে তেমন কোন বাধ্য-বাধকতা অনুভব করে না। মাছের সরবরাহ বৃদ্ধির জন্যেও তারা কোনো বিনিয়োগে তেমন আগ্রহী হয় না। সমবায়ভিত্তিক মৎস্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা এরূপ একচেটিয়া আধিপত্য থেকে উৎপাদক ও ভোক্তাদের রেহাই দিতে পারে। স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের মাধ্যমেও মৎস্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করা যায়।
মাছ একটি অতি উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাদ্য। বাংলাদেশে এর ঘাটতি প্রচুর। এর উৎপাদন ব্যবস্থাও তেমন দক্ষ নয়। সে কারণে এ দেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বিস্তর। আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ধারণ ত্বরান্বিত করে মাছের উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। এর জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মসূচিকে জোরদার করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে মৎস্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার।
মানব ইতিহাসের একেবারে আদিকালেও মাছ মানুষের খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয় ছিল। মাছের পেশীকলায় বা আমিষে ৬০-৮২% পানি, ১৩-২০% প্রোটিন এবং কম বেশি চর্বি থাকে। এগুলির জন্যই মাছ উপাদেয় খাদ্য এবং কেবল বাংলাদেশের মানুষেরই নয়, পৃথিবীর বহু জাতির কাছেও।
স্মরণাতীতকাল থেকে বাংলার মানুষ খাদ্যের জন্য প্রকৃতির এই দান আহরণ করছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরা যেন এক ধরনের শিকার। বাস্তবিকই, মাছ ধরা কৃষি কাজের চেয়েও পুরানো এবং মাছ সর্বদাই মানুষকে সুস্বাদু ও উচ্চমানের প্রোটিন সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রকৃতি প্রদত্ত ও প্রধান আহার্য বিধায় ঐতিহ্যগতভাবে এই দেশের মানুষকে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ বলে অভিহিত করা হয়।
ফ্রান্সিস হ্যামিলটনের (Hamilton, ১৮২২) গবেষণা থেকেই বাংলাদেশের স্বাদুপানির মৎস্যকুল সম্পর্কে জানার সূত্রপাত ঘটে। ফ্রান্সিস ডে ১৮৭৮ সালে উপমহাদেশের সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছ সম্পর্কে একটি বিবরণ প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে বহু গবেষণাকর্ম পূর্ববাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যচাষ বিষয়ক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।
সাবেক বাংলার রাজস্ব বোর্ডের সদস্য কে.জি গুপ্ত কর্তৃক ১৯০৮ সালে প্রদেশের মৎস্য খাতের সম্ভাবনা বিষয়ে প্রথম অনুসন্ধানকার্য পরিচালনার ফলেই মৎস্য অধিদপ্তর গঠিত হয় এবং পরে ১৯১০ সালে তা কৃষি বিভাগের অঙ্গীভূত হয়। ১৯১৭ সালে মৎস্য বিভাগ আলাদা করা হলেও যোগ্য লোকবলের অভাবে বাংলার ব্যয়সঙ্কোচন কমিটির (Bengal Retrenchment Committee) সুপারিশক্রমে ১৯২৩ সালে এটি বিলুপ্ত করা হয়। অবশ্য, মাদ্রাজের (বর্তমান চেন্নাই) এম. আর নাইডুর সুপারিশে ১৯৪১ সালে বাংলার মৎস্যসম্পদের উন্নয়নকল্পে মৎস্য বিভাগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯৪০ সাল থেকেই চিংড়িচাষ চলছে। চাষকৃত চিংড়ির প্রধান ক্রেতা ছিল কলকাতার বাজার। ভারত বিভক্তির পর বাংলাদেশের চিংড়ি চাষীরা কলকাতার বাজার হারায় এবং চিংড়িচাষ ক্রমে লোপ পেতে থাকে। পরবর্তী সময়ে বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে বিশ্ববাজারে চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি পেলে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার প্রভৃতি এলাকায় আবার চিংড়িচাষ শুরু হয়। ধানক্ষেতে মাছচাষ বাংলার পুরানো প্রথা। অবশ্য, ধানক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার সম্প্রতি মাছচাষে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
আবাসস্থলে অভিযোজিত হওয়ার কারণে মাছকে স্বাদুপানির, স্বল্প লোনাপানির, সামুদ্রিক ও পরিযায়ী ইত্যাদি বাস্ত্তসংস্থানিক দলে ভাগ করা হয়েছে। স্বাদুপানির মাছ সর্বদাই স্বাদু পানিতে বাস করে। স্বল্পলোনাপানির মাছ সমুদ্রের স্বল্পলবণাক্ত অঞ্চল ও নদীর মোহনার বাসিন্দা। সামুদ্রিক মাছ সমুদ্রের পানিতে থাকে এবং মহাসাগরের উন্মুক্ত জলরাশির পৃষ্ঠভাগে বা উপকূলীয় লোনাপানিতে বসবাস করতে পারে। পরিযায়ী মাছ প্রজননের জন্য সমুদ্রের লোনাপানি থেকে স্বাদুপানিতে (ইলিশ, Tenualosa ilisha) অথবা স্বাদুপানি থেকে সমুদ্রের লোনা পানিতে যায়। (বাইম, Anguilla bengalensis)।
প্রধান নদীগুলি (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র) বাংলাদেশের উপর দিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। বহু নদী ও তাদের শাখা-প্রশাখা সারাদেশে জালের ন্যায় বিস্তৃত। বাংলাদেশের প্রায় ৫৪টির পানি ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবহার করতে হয়। বিশ্ব ব্যাংক ১৯৯১ সালে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, মাছের ফলন ও পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে পানিসম্পদসহ (নদী, প্লাবনভূমি, পুকুর, বিল, বাওড় ও সুদীর্ঘ উপকূল) উপযুক্ত জলবায়ু ও পরিবেশ রয়েছে। বর্ষাকালে নদীর কূল উপচানো পানিতে প্রাকৃতিক খাদ ও সমভূমি, নিচু জমি, বদ্বীপ ও চরাঞ্চল ডুবে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে মিশে এক অভ্যন্তরীণ সমুদ্র গড়ে তোলে। আবার শুকনো মৌসুমে অধিকাংশ নদী শুকিয়ে খুবই ছোট হয়ে যায় এবং অধিকাংশ পুকুর ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে পড়ে।
সবগুলি নদীর গতিপথেই রয়েছে বিস্তৃত প্লাবনভূমি। খাল দ্বারা যুক্ত নদী, প্লাবনভূমি ও প্রাকৃতিক নিম্নভূমিতে (বিল ও হাওরসহ) বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। প্লাবনভূমিগুলি মাছের বিপুল সংখ্যক পোনা উৎপাদনে পুষ্টিসমৃদ্ধ নার্সারির ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, খাল খনন ও সেচ প্রকল্পের জন্য ব্যাপক পানি ও ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে দেশের জলাধার ও ভূদৃশ্যের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। বন্যার বিপুল পরিমাণ পানির ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রশমন আবশ্যক ছিল। কিন্তু এটি বাংলাদেশের জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও বাস্ত্তসংস্থানের পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটিয়েছে। এসব কর্মকান্ড ইতোমধ্যেই মাছ ও অন্যান্য জীবসম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ষাটের দশকে মোট প্লাবনভূমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ লক্ষ হেক্টর, ১৯৮৫ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ লক্ষ হেক্টরে এবং ২০০৮ সালে তা আরও হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় মাত্র ২৮ লক্ষ হেক্টরে। জলজ আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মাছের উৎপাদনও কমে আসে। মাছের ওপর বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রভাব নিম্নরূপ: মাছের আবাসস্থলের ক্ষতির দরুন মাছের আহরণে ঘাটতি, প্রতি একক স্থানে মাছ ধরার পরিমাণ হ্রাস, মাছের ঘনত্ব/প্রাচুর্য হ্রাস, বেশি মাছ আহরণের চেষ্টা, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, পরিযায়ী মাছের সংখ্যা ও মাছের বিচরণের সংখ্যা হ্রাস, জেলেদের সম্প্রদায়গত পরিকাঠামোয় ভাঙন, রেগুলেটরসমূহে অধিক মাছ আহরণের কারণে মাছের অভিপ্রয়াণের সুযোগ হ্রাস, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ হ্রাস ইত্যাদি।
নদী, প্লাবনভূমি, বিল এবং হাওর ছাড়াও বাওড় নামের অনেকগুলি জলাশয় রয়েছে বিশেষত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের যশোর ও খুলনা জেলায়। মূল নদী থেকে নদীর বাঁক বিচ্ছিন্ন হয়ে সৃষ্ট পৃথক জলাশয় বাওড়ে পরিণত হয়।
এক বিশাল জলাশয় কাপ্তাই হ্রদের আয়তন প্রায় ৬৮,৮০০ হেক্টর। পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পঞ্চাশের দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলি নদীর উপর বাঁধ দিয়ে এ হ্রদ তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে মানুষের তৈরি এটিই স্বাদুপানির বৃহত্তম জলাধার, যা মুক্ত পানিব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নয়। মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে এই হ্রদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া রয়েছে প্রায় অসংখ্য পুকুর, যার মোট জলভাগের আয়তন প্রায় ৩,০৫,০২৫ হেক্টর। পুকুরগুলি ছোট (০.০১ হেক্টরের কম), মাঝারি (০.১-০.৬ হেক্টর) ও বড় (০.৬ হেক্টরের অধিক) এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। পুকুরগুলির অন্য শ্রেণীবিভাজন হলো: ১. মাছচাষকৃত পুকুর: যেসব পুকুরে মাছের পোনা ছাড়া হয়; ২. চাষযোগ্য: যেসব পুকুরে মাছের পোনা ছাড়া হয় না; এবং ৩. পরিত্যক্ত পুকুর: যেসব পুকুর মাছচাষের উপযুক্ত নয়। বিভিন্ন জেলায় শ্রেণি অনুসারে পুকুরের বিন্যাসও বিভিন্ন। জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ৪৬% পুকুরে (পুকুরের মোট আয়তনের ৫২%) মাছচাষ হয়। বাদবাকি পুকুর মাছচাষের অনুপযুক্ত, পরিত্যক্ত বা নিম্ন উৎপাদনক্ষম। সব পুকুরই নানাভাবে ব্যবহূত হয়; ৬৩% ধোওয়া-গোসল, ২৫% মূলত মাছ ধরা, ৭% প্রধানত সেচ এবং ৫% পুকুর অন্যান্য উদ্দেশ্যে ব্যবহূত হয়।
বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমানা জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। দেশের উপকূল রেখা প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দেশের অর্থনৈতিক জলসীমা এলাকা (Exclusive Economic Zone) হিসেবে সমুদ্রসীমার আয়তন প্রায় ১,২৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এদিক থেকে এলাকা বেশ বড়, তবে সীমিত সম্পদ দিয়ে এর টেকসই উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন যথার্থ অনুসন্ধান, আহরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা। বঙ্গোপসাগরে তিনটি বৃহৎ মৎস্য আহরণ অঞ্চলের সন্ধান পাওয়া গেছে: ১. দক্ষিণাঞ্চল (৬২০০ বর্গ কিমি) ২০৫০ উত্তর-২১৪০ উত্তর এবং ৯১ পূর্ব-৯১-এর মধ্যবর্তী; ২. মধ্যাঞ্চল (৪,৬০০ বর্গ কিমি) ২০৫০ উত্তর-২১২০ উত্তর এবং ৯০ পূর্ব-৯১-এর মধ্যবর্তী; এবং ৩. সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (৩,৮০০ বর্গ কিমি) ২১ উত্তর-২১৪০ উত্তর এবং ৮৯ পূর্ব- ৯০ এর মধ্যবর্তী। এই তিনটি মৎস্য আহরণ অঞ্চলের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চল অধিক উৎপাদনশীল, প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মজুদের পরিমাণ আনুমানিক ১১.৪-১৬ মে টন, তারপরই সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড যেখানে মজুদ ১০.২-১৪.৪ মে টন এবং মধ্যাঞ্চলে মজুদ ৮.৪- (Fish biodiversity) উন্মুক্ত জলাশয়ে (নদী, প্লাবনভূমি, হাওর, বিল, হ্রদ, নদীর মোহনা ও সমুদ্র) বাস করে বিভিন্ন জাতের মাছ ও চিংড়ি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্বাদুপানিতে প্রায় ২৬৬ প্রজাতির পাখনাযুক্ত মাছ রয়েছে। শফি ও কুদ্দুস (১৯৮২) বাংলাদেশের স্বাদুপানির ৩৬টি গোত্রের ১৪৮ প্রজাতির মাছ ও ১০ প্রজাতির Palaemonidae গোত্রের চিংড়ি শনাক্ত করেছেন, যাদের প্রায় সবগুলিই খাবারযোগ্য ও জনপ্রিয়। অভ্যন্তরীণ স্বাদুপানির উল্লেখযোগ্য মাছের মধ্যে রয়েছে বড় কার্প (রুই, কাতলা ও মৃগেলসহ ৬ প্রজাতি) এবং ছোট কার্প ও স্বাদুপানির ছোট মাছ (পুঁটি, চেলা, মলা ও বার্বেলযুক্ত মাছসহ ৪১ প্রজাতি), Perch (মেনি, বেলা, চেওয়া ও চান্দাসহ ৩১ প্রজাতি), Catfish (পাঙ্গাশ, বোয়াল, মাগুর, শিং, আইড়, রিটা, পাবদা ও বাচাসহ ২৯ প্রজাতি), Shad (অভ্যন্তরীণ মাছের ৪০% সরবরাহকারী ইলিশ, চাপিলা, কাঁচকি ও ফ্যাসাসহ ১০ প্রজাতি), টাকিজাতীয় (গজার, টাকি ও শোলসহ ৫ প্রজাতি), Loach (৭ প্রজাতি) ও Featherback (চিতলসহ ২ প্রজাতি)। রহমান (১৯৮৯) বাংলাদেশের স্বাদুপানির ২৬০ প্রজাতির মাছ তালিকাভুক্ত করেছেন। Bernascek ও তাঁর সঙ্গীরা (১৯৯২) বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৩১ গোত্রভুক্ত ১৩৭ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ শনাক্ত করেছেন। স্বাদুপানির চিংড়ির Macrobrachium গণভুক্ত অন্তত ৯টি প্রজাতি রয়েছে।
কয়েকটি বড় নদী (হালদা, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র) বড় কার্পের ডিম, রেণু ও পোনা উৎপাদনের স্থান। পুকুরে মৎস্যচাষের চাহিদা মিটানোর জন্য এগুলি সংগ্রহ করা হয়। মৎস্যচাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের পুকুর ও হ্রদে কতকগুলি বিদেশী মাছ তেলাপিয়া (২টি প্রজাতি), চীনা সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বিগহেড কার্প, ব্ল্যাক কার্প, সাধারণ কার্প (৪টি প্রজাতি), থাই পুঁটি, থাই পাঙ্গাশ, আফ্রিকার মাগুর ইত্যাদিরও চাষ প্রবর্তন করা হয়েছে।
হুসেইন (১৯৬৯) বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীমোহনার পানিতে ১৩৩ গোত্রের ৪৭৫ প্রজাতির মাছ তালিকাভুক্ত করেছেন। কুদ্দুস ও শফি (১৯৮৩) কর্তৃক সমুদ্র ও স্বল্পলোনাপানি থেকে শনাক্তকৃত ১৬৯ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৫৯ গোত্রভুক্ত ১৪৮ প্রজাতির মাছ অস্থিময় ও ১০ গোত্রভুক্ত ২১ প্রজাতির মাছ কোমলাস্থিবিশিষ্ট। এদের মধ্যে বেশির ভাগই সামুদ্রিক Perch-জাতীয় (৩০ গোত্রের ৬৩ প্রজাতি) মাছ। এরপর রয়েছে Herring ও Shad (৩ গোত্রভুক্ত ২১ প্রজাতি), Catfish (৩ গোত্রভুক্ত ১৯ প্রজাতি) ও Flatfish (৫ গোত্রভুক্ত ১৬ প্রজাতি)। সমুদ্র থেকে আহরিত মাছের শতকরা ৬০ ভাগ হলো ইলিশ। বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকায় রয়েছে ১০ প্রজাতির হাঙ্গর। সামুদ্রিক মাছের প্রায় ৬৫% বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সামুদ্রিক চিংড়ির ১৭ প্রজাতির মধ্যে Penaeus গণের ৬, Metapenaeus-এর ৫, Parapenaeopsis-এর ৪ এবং Solenocera-এর ২টি প্রজাতি রয়েছে। অবশ্য, মাত্র ৫ প্রজাতির চিংড়ি যেমন, Penaeus monodon, Penaeus semisulcatus, Penaeus indicus, Metapenaeus monoceros এবং Metapenaeus brevicornis বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে ৫ প্রজাতির লবস্টারের (crustacean) মধ্যে সাধারণত কেবল ২ প্রজাতিই (‘Panulirus polyphagus, Scyllarus nearctus) সহজলভ্য। [মোহাম্মদ শফি]
(Fisheries co-operatives) কর্মরত মৎস্যজীবীদের একটি সংগঠন, যেখানে তারা অধিকতর কার্যকর মৎস্য আহরণ ও অপেক্ষাকৃত বেশি মুনাফা লাভের জন্য সম্পদ লগ্নি করে। মৎস্যজীবীদের জন্য মাছ ক্রয় ও বিক্রয় বা মাছ ধরার সরঞ্জাম বীমাকরণ ইত্যাদি সমবায়ের কর্মকান্ডের অন্তর্ভুক্ত। জাপান, নরওয়ে ও অন্যান্য দেশের মৎস্যজীবীরা হাজার হাজার সফল সমবায়ের আওতাভুক্ত, আর সেসব দেশে ঋণ-সুবিধা, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাদি সমবায়ের দায়িত্ব।
Leave a Reply