শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ফকিরহাটে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স প্রতিযোগিতার উদ্বোধন সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ যশোরে দুই মাদক ও অস্ত্র মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবনসহ ১৭ বছরের কারাদণ্ড যশোরে দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শরণখোলায় কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার তালায় খাঁচায় আটকে গুরুতর আহত বনবিড়ালের বাচ্চা উদ্ধার ডুমুরিয়ায় দুর্বৃত্তের দেয়া বিষে ৫ লক্ষ টাকার মাছ নিধন খুলনাকে আবারও শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উজিরপুরে ব্যাপক আয়োজনে নতুন কুঁড়ি শুভ উদ্বোধন ​উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন

জলবায়ুর গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে নিজেদেরকে নানা মাত্রিক নিয়ম মানতে হবে

  • প্রকাশিত সময় : রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৭ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে এসব বিষয় নিয়ে জোরালো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমাদের জন্য উচিত হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আলোচ্য ইস্যুগুলোকে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিবেচনা করা।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত। এই দেশের অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান, প্লাবনভূমির আধিপত্য এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিম্ন উচ্চতা, উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এর উপকারিতাসমূহের ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতার কারণেই এমনটা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইতিমধ্যে কয়েক লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশের উন্নয়ন ধারা ব্যাহত হচ্ছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অভিযোজন (অ্যাডাপ্টেশন) ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। বৃষ্টিপাতের ধরন ও তাপমাত্রার ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং কৃষকদের এই ক্ষতি মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য এখন গোষ্ঠীভিত্তিক অভিযোজন-এর (কমিউনিটি বেইজড অ্যাডাপ্টেশন-সিবিএ) চিন্তা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের বেশির ভাগ লোক কোনো না কোনোভাবে কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের কৃষি খাতে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের উপকূল ও চরাঞ্চলগুলোতে মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। এসব অঞ্চলের মানুষের কৃষিকাজ পানির ওপর নির্ভরশীল। বছরের বৃহত্ একটা সময় চরের নিম্নভূমি পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া চরের মাটিও অন্যান্য মাটির চেয়ে ভিন্ন। চরের কৃষি ব্যবস্থাপনা গতানুগতিক। পাশাপাশি চরাঞ্চলে কৃষির আধুনিক সুযোগগুলোর অপ্রতুলতাও রয়েছে। অধিকন্তু জলবায়ুর পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে চরগুলোতে বর্ষা মৌসুমে বন্যা, নদীভাঙন, বজ পাত, ঘূর্ণিঝড়, শুকনো মৌসুমে খরা, আর্দ্রতার অভাব ইত্যাদি সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করছে। অন্যদিকে উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ত পানির প্রভাব দিনদিন বেড়েই চলছে। ফলে কৃষিজমির কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং সুপেয় পনির সংকট বাড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূল অঞ্চলের প্রধান সুপেয় পানির উত্স পুকুরগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।  জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাব অব্যাহত থাকলে চরাঞ্চল ও উপকূল অঞ্চলে দিন দিন মানবিক, অর্থনৈতিক ও জীববৈচিত্র্যসহ সামাগ্রিক সংকট বৃদ্ধি পাবে এবং মানুষের জীবন ও জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এই ক্ষতি এড়াতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গোষ্ঠভিত্তিক অভিযোজন (সিবিএ) কার্যক্রম বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
আশার দিক হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান-ন্যাপ) চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়াধীন। জলবায়ু পরিবর্তনের ‘ফ্রন্টলাইনার’দের পর্যাপ্ত জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম দিয়ে সার্বিক বিষয়ে প্রস্তুত করা সময়ের দাবি, যাতে তারা প্রয়োজনে তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট এবং ফলাফল খুবই অনিশ্চিত ও আকস্মিক। ফলে এর ঝুঁকি ও ক্ষতি পরিমাপ করা খুব একটা সহজ হয় না। তাই এসব অঞ্চলের অধিবাসীদের স্থানীয় জ্ঞানকে আমলে নিয়ে তার সঙ্গে নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তিসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্থানীয় অধিবাসীরা যুগের পর যুগ এসব অঞ্চলে বসবাস করে আসছেন। তাদের নিজস্ব কিছু সহজাত জ্ঞান রয়েছে যেগুলো ব্যবহার করে তারা দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। স্থানীয় তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে তাদের সহজাত শস্য চক্র, ঝুঁকি চক্র এবং জীবনযাত্রার চক্রকে বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক জ্ঞানকে সমন্বয় করে স্থানীয় অভিযোজন মডেল প্রস্তুত করতে পারলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ভালো ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। স্থানীয় বৈচিত্র্যগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সিডর বা মহসেনে স্থানীয় গাছগুলো ক্ষতি হ্রাসের ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করেছে। তাই স্থানীয় বৈচিত্র্যগুলোকে পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-উক্রেন যুদ্ধ আমাদের আরো একবার শিখিয়ে গেছে যে, আমাদের প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের (ন্যাচার বেইজড সল্যুশন) কথা ভাবতে হবে।
এছাড়া স্থানীয় প্রাকৃতিক ভূচিত্রকে (লোকাল ল্যান্ডস্কেপ) আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। নদী-নালা, খাল-বিল, বনজঙ্গলসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক অবকাঠামোর আকৃতি-প্রকৃতি কেমন ছিল এবং এগুলো কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে—তা বোঝা দরকার। আমরা যদি স্থানীয় ভূচিত্রকে পুনরুদ্ধার বা সংরক্ষণ করতে পারি, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করার পথ আরো সুগম হবে। তবে এজন্য সেই স্থানীয় অধিবাসীদের সহজাত জ্ঞানকেই কাজে লাগাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে স্থানীয় ভূচিত্রের কেমন পরিবর্তন হয়েছে, তা ভূচিত্রের আদিপ্রকৃতি দেখে যথাসম্ভব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা এবং কর্মকৌশল ঠিক করা প্রয়োজন। স্থানীয় সম্পদসমূহকে একটি তালিকায় নিয়ে আসা দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা আছে যেগুলো স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব স্থানীয় সম্পদসমূহকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে স্থানীয়দের সহজাত জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সারা বিশ্বে এখন আগাম কার্যক্রম (এন্টিসিপেটরি অ্যাকশন) গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ আগাম কার্যক্রম জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতিকে হ্রাস করতে সাহায্য করে। এজন্য প্রয়োজন স্থানীয়ভিত্তিক (লোকাল বেইজড) কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন। সেটির আলোকে সম্পদ ও সুযোগসমূহকে প্রস্তুত রাখা জরুরি। এগুলো করতে পারলে বৈশ্বিক নিঃসারণ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত সমন্বিত অভিযোজন প্রচেষ্টার মাধ্যমে চলমান ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নাহলে নিঃসারণ সংক্রান্ত বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে থাকতে গেলে আমাদের চলমান ক্ষতি আরো বাড়তে থাকবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের অধিকতর সুযোগ ও সম্পদসহ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার বিষয়ক কর্মসূচিসমূহ জলবায়ু প্রেক্ষাপটে ঢেলে সাজাতে হবে।
স্থানীয় উদ্যোগে অভিন্নতা ও অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য একটা নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত হবে। এজন্য স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন শীর্ষক যে আটটি নীতিমালাকে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো সবার জন্য অভিন্ন নীতিমালা হতে পারে। আমাদের উচিত হবে সেগুলো অনুসরণ করা। তাহলে স্থানীয়ভিত্তিক অভিযোজন প্রক্রিয়াটি পরিচালনার জন্য বৈশ্বিকভাবে সবার জন্য একটি গতিবেগ তৈরি হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সিবিএ-১৬ সম্মেলনে এসব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশে উপরিউক্ত বিষয়গুলোকে আরো শক্তিশালী করার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। তাহলে আমরা আগামী দিনের জন্য পাথেয় খুঁজে বের করতে পারব। এসব উদ্যোগ আমরা তাত্ক্ষণিকভাবে শুরু করতে পারি। সেজন্য আমাদের বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের জন্য বসে থাকতে হবে না। আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৭) এসব বিষয় নিয়ে জোরালো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমাদের জন্য উচিত হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আলোচ্য ইস্যুগুলোকে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিবেচনা করা। আমাদের দূরদর্শী চিন্তা, কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা এবং তদানুযায়ী কার্যক্রম জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি থেকে অনেকাংশে সুফল পাওয়া সম্ভব।জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো দায়ী হলেও এর প্রভাবে সব চেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো। এগুলোর মধ্যে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ হবে মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশ এবং ২১০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপির) ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সামষ্টিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে ক্ষতির পরিমাণ ২১০০ সাল পর্যন্ত জিডিপির ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে। ‘জলাবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ব্যয় নিরূপণ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশের মোট জনশক্তির প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষি কাজে নিয়োজিত। অত্যধিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, দাবদাহ এবং উৎপাদন মৌসুমের সময় কমে যাওয়ার মতো কারণে চাল, গম ও আলু উৎপাদন বর্তমান সময়ের চেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ কমে যেতে পারে। এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপন, নদী-নালা, খাল-বিলে শিল্পবর্জ্য ফেলা, জলাশয় ভরাট, বন ও বৃক্ষ উজার করার মতো কাজগুলোও দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিনষ্টের জন্য কম দায়ী নয়। দেশের ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশি উপকূলীয় অঞ্চলে তিন কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের বর্তমানের চেয়ে বেশি ঝড়ের মুখোমুখি হতে হবে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর কৃষিজমি নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বিলীন হয়ে যাবে। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। ফসলের উৎপাদন মারাত্মক হ্র্রাস পাবে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ১ মিটার বাড়ে, তা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে খুলনা বিভাগ সবচেয়ে বেশি। এতে ঢাকা বিভাগের ১৪ শতাংশ জায়গা তলিয়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলীয় এলাকার সম্পদও বিনষ্ট হবে প্রচুর। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত মোকাবিলার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় এখন থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর কমপক্ষে ৭৩ বিলিয়ন ডলার বা এ অঞ্চলের মোট জিডিপির দশমিক ৮৬ শতাংশ ব্যয় করতে হবে।
শিক্ষা, স্বাস্থ, অবকাঠামো ও আর্থসামাজিকসহ বিভিন্ন খাতের খসড়া হিসাব করেই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমানোর জন্য দুই ধরনের উপায় গ্রহণের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। এক. বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, যা বাংলাদেশের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ জন্য বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। তারা কার্বন নির্গমণ হ্রাসে বাস্তব ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই তা সম্ভব, দুই. উন্নত দেশগুলোর দেওয়া জলবায়ু তহবিলের অর্থ যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির কমিয়ে আনা। এ জন্যও প্রচুর অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। জলবায়ুর বিরূপ আচরণের কারণে বন, জলাভূমি এবং বিশ্বের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ২০৩০ সালে বছরে আট কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০৫০ সালে বছরে ৩৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করতে হবে বলে উলেখ করেছে এডিবি।
এখন প্রশ্ন হলো জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ কী এত বিপুল অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম হবে? এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভুটান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০৫০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোতে সম্মিলিতভাবে জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। তবে বিশ্ব যদি এখনকার প্রাকৃতিক জ্বালানিকেন্দ্রিক পথ ধরে চলতে থাকে, তাহলে ২১০০ সালে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে। প্রতিবেদনের সার সংক্ষেপ তুলে ধরে এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বিন্দু লোহানি বলেন, এশিয়ার সব দেশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাবে ধানের উৎপাদন ২৩ শতাংশ কমে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে এই অঞ্চলে সাড়ে ৯ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বাইরে আরো ১০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে। তা ছাড়া এর প্রভাবে জ্বালানি ও পানি সংকট দেখা দিতে পারে। কারণ ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে দ্বিগুণ হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রতি বছরই ৬ শতাংশের বেশি করে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে উৎপাদনের বড় একটা অংশ ক্ষতি হলে দারিদ্র্য দূর করতে একটু বেশি সময় লাগবে। জলবায়ু পরিবর্তনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জীবনমান চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মালদ্বীপ ও নেপাল। বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে মালদ্বীপ তার মোট দেশজ উৎপাদনের ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হারাবে। আর নেপাল হারাবে তার মোট দেশজ উৎপাদনের ৯ দশমিক ৬ ও শ্রীলঙ্কা জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারাবে। জরাবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব এবং মোকাবিলায় কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় বর্তমান সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ পানি প্রবাহ ও কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাবে। গবেষকরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে যেমন শস্য উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে, তেমনি এই অববাহিকায় অবস্থিত দেশসমূহের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এখন থেকেই গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে।
জলাবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি হতে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য সরকার ব্যাপক ভিত্তিতে বৃক্ষরোপণের কমৃসূচি গ্রহণ করেছে। একই কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান, ভুট্টা, সুগারবিট, আখ, সূর্যমুখীর মতো ঘাত সহিষ্ণু ফসল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে তাপ ও জলমগ্নতা সহিষ্ণু ফসলে জাত উদ্ভাবন এবং উৎপাদন প্রযুক্তি কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার। প্রয়োজনে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শস্য বিন্যাস ও শস্য ক্রমের পরিবর্তন করতে হবে। উদ্ভাবন করতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাত সহিষ্ণু গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ ও জলজ প্রাণীর নতুন নতুন জাত ও লালন-পালনের নতুন কৌশল। সেই সঙ্গে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। বিশ্বের সব দেশে যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২১০০সালের মধ্যে ২ ভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অঙ্গীকার রক্ষা করে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে থাকবে। আর ২১০০ সালের মধ্যে তা বেড়ে সর্বোচ্চ আড়াই শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪ হাজার ৬ লাখের মধ্যে। এ হিসেবে দেশগুলোর মোট জিডিপি দশমিক ৪৮ শতাংশের মধ্যেই থাকবে ক্ষতির পরিমাণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটি মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। গ্রাম ছেড়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেবে। তাদের খাদ্য-পুষ্টি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য এ পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
বিশ্বে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য অন্যতম দায়ী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। পশ্চিমা বিশ্বের দ্বারা সৃষ্ট হলেও নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপকে গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, সে অনুযায়ী সাহায্য পাওয়া যায় না। ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রতি বছর প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা নয়। এটি এখন এক ভয়াবহ বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তাই মানব জাতির অস্তিত্ব ও টিকে থাকার স্বার্থে এই সমস্যা মোকাবিলায় সব দেশকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।আধুনিকায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী। পরিবর্তিত হচ্ছে জলবায়ু। কোনো এলাকা বা ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০-৩৫ বছরের গড় আবহাওয়াই হচ্ছে জলবায়ু। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নামে অধিক পরিচিত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে ‘গ্রিনহাউস প্রভাব’ বলা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের শুধু একটি কারণ নয়, অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান। কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরো কার্বনসহ বিষাক্ত গ্যাসের নিঃসরণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ, গ্রিনহাউস গ্যাস ও মানব সৃজিত কর্মকাণ্ড দ্বারা পরিবেশদূষণ। যেমন- পারমাণবিক বিস্ফোরণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, কলকারখানা ও গাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া,  বেশি বেশি ফসল পাওয়ার জন্য জমিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ গাছ কেটে সবুজ ধ্বংস অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পকারখানা স্থাপন, ইটের ভাটা, জ্বালানি ইত্যাদি।
পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা প্রকারের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন- অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। যার ফলে জ্ঞান ও মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এর কারণে প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্র বিশ্বের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আবহাওয়ার মৌসুমি ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (CRI) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষা চালানো হয় ১৯৯০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ১৯৩টি দেশের ওপর।
উল্লেখ্য, ওই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্তের বিচারে বিশ্বব্যাপী গবেষকরা বাংলাদেশকে পোস্টার চাইল্ড (Poster Child) হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।
গবেষনায় বলা হয়, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে যাবে। আর উপকূলীয় এলাকায় এখন যে ৪৩ লাখ মানুষ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার, তাদের সংখ্যা দাঁড়াবে ২ কোটিতে।
জলবায়ু গবেষক ড. আহসান চৌধুরী বলেন, গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত তালিকার শীর্ষে আছে ঠিকই, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা নেই। তবে আমরা আন্তর্জাতিক ফোরামে জোর দাবি তুলতে পারি। কারণ, কার্বন নিঃসরণে আমাদের ভূমিকা একেবারে নগণ্য। এ জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো। তারা এর ক্ষতিপূরণ দেবে বলেও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি বলেন, আশঙ্কা করা হচ্ছে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ বাড়িঘর হারাবে ২০৫০ সালের মধ্যে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বন্যাপ্রবণ এলাকায় দেখা যায়, প্রতিবছরই নদীভাঙনে শত শত বাড়িঘর বিলীন হয়ে যায়। এরাই তো বাস্তুচ্যুত। এ বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক তহবিল দরকার। আবার আমাদের সরকারের জলবায়ু অভিযোজনে অগ্রাধিকার প্রকল্প নিতে হবে। এ জন্য আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ রিসার্চ কেন্দ্রের গবেষক ড. এহতেশামুল কবির বলেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি হচ্ছে মানুষেরই ভুলের কারণে। এটা আসলে প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়। এ জন্য বাস্তুচ্যুতদের অধিকার আদায়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে জোর দাবি জানাতে হবে আন্তর্জাতিক ফোরামে। এখন সময় এসেছে, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতদের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ প্রটোকল থাকা উচিত।
আবহমান কাল থেকে এ দেশে ঋতুবৈচিত্র্য বর্তমান ছিল, ছয়টি ঋতুর বৈশিষ্ট্য আলাদা আলাদাভাবে এ দেশে উপলব্ধ হয়; গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ-হেমন্ত-শীত- বসন্ত -এই ছয় ঋতুর কারণে দেশটিকে ষড়ঋতুর দেশও বলা হয়ে থাকে। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয়। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল চলে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকে, তাই জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময়ই বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। এ ছাড়াও মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের আগমুহূর্তে কিংবা বিদায়ের পরপরই স্থলভাগে ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, কিংবা সাগরে নিম্নচাপ, জল-ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়, যার আঘাতে বাংলাদেশ প্রায় নিয়মিতই আক্রান্ত হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও তার ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে এখন দেশের ছয়টি ঋতুর বৈশিষ্ট্যই পাল্টে যাচ্ছে।
২০০০ সনে প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে কক্সবাজার উপকূলে বছরে ৭.৮ মিমি. হারে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। গত চার দশকে ভোলা দ্বীপের প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ২১০০ সাল নাগাদ সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মি. উঁচু হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১৮.৩ অংশ নিমজ্জিত হতে পারে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্রমতে, রাজশাহীর উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সনে পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট, ২০০০ সনে তা নেমে ৬২ ফুট এবং ২০০৭ সালে তা নেমে যায় ৯৩.৩৪ ফুটে। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের মোট আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। বর্তমানে বন্যার সংখ্যা ও তীব্রতা দুটিই বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন সিডর আক্রমণ করার মাত্র দুই বছরের মধ্যে শক্তিশালী সাইক্লোন নার্গিস ও আইলা এবং ২০১৩ সালের মে মাসে মহাসেন (আংশিক) আঘাত হেনে কৃষিকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে উফশী ধানের ফলন কমে যাবে এবং গমের রোগের আক্রমণ বাড়বে। বাংলাদেশে বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে গম চাষ সম্ভব হবে না। ধান গাছের কচি থেকে ফুল ফোটার সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি হলে এবং অতি নিম্ন তাপে (২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) শিষে ধানের সংখ্যা কমে যেতে পারে। ফুল ফোটা বা পরাগায়নের সময় যদি অতি উষ্ণ তাপ থাকে তাহলে চিটার সংখ্যা থোড় অবস্থার চেয়ে বেশি হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার কারণে ধান গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ধান গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে, ধানের চারা দুর্বল হয় এবং ফসলের জীবনকাল বেড়ে যায়।
১৮৫০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৭৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ৫০ বছরের প্রতি দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা গত ১০০ বছরের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। গত ২০১২ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বিংশ শতাব্দীর চেয়ে ০.৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
সম্প্রতি ‘নাসা’ একটি ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। গত ৪০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার এমান্ডসন সাগরের কাছে থাকা কিছু গ্লেসিয়ার (বরফের সিট) এমনভাবে গলে গেছে যে, তা আর কোনোভাবেই বরফ হয়ে ফিরে আসবে না। ওই গ্লেসিয়ার যদি সম্পূর্ণ গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১.২ মিটার বেড়ে যাবে। আর যদি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার সমস্ত বরফ গলে যায়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩.৫ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার পাশাপাশি পূর্ব অ্যান্টার্কটিকাতেও বরফ ক্ষয়ের একই প্রবণতা লক্ষ্ করা যাচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের বরফের চূড়ার ক্ষয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আরও ভয়াবহ অশনি সংকেত দিচ্ছে। যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির আগাম ধারণা আগামী দুই-তিন দশকেই আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে চীন ও বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপদে পড়বে বলে নাসা সতর্ক করে দিয়েছে।
সাইক্লোন সিডরে সাড়ে ৩৪ লাখ মানুষের বাড়িঘর ভেসে গিয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালে ওই ধরনের সাইক্লোনে তিন মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস হবে। এতে ৯৭ লাখ লোকের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। ২০৮০ সাল নাগাদ সমুদ্রস্তর ৬৫ সেন্টিমিটার উঁচু হলে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল ৪০ শতাংশ উৎপাদনশীল ভূমি হারাবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় দুই কোটি মানুষ খাবার পানিতে লবণাক্ততার সমস্যার মুখে পড়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে বন্যার ঝুঁকিও বাড়বে। বন্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে।
২০১৬ সালে ৭ নভেম্বর মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মারাকাশ জলবায়ু সম্মেলন। এটা ছিল ২২তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্বের ৫৪টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা। ১২০টি দেশের মন্ত্রী বা মন্ত্রপর্যায়ের প্রতিনিধিরিাও এতে যোগ দিয়েছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT