শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ফকিরহাটে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স প্রতিযোগিতার উদ্বোধন সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ যশোরে দুই মাদক ও অস্ত্র মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবনসহ ১৭ বছরের কারাদণ্ড যশোরে দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শরণখোলায় কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার তালায় খাঁচায় আটকে গুরুতর আহত বনবিড়ালের বাচ্চা উদ্ধার ডুমুরিয়ায় দুর্বৃত্তের দেয়া বিষে ৫ লক্ষ টাকার মাছ নিধন খুলনাকে আবারও শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উজিরপুরে ব্যাপক আয়োজনে নতুন কুঁড়ি শুভ উদ্বোধন ​উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন

কেন বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ?

  • প্রকাশিত সময় : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৮ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : প্রতি বছরই বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ছে বাংলাদেশ। গেল বছরের ২৪ অক্টোবর দেশে হানা দেয় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং। ঘূর্ণিঝড়টি সারাদেশে ব্যাপকভাবে প্রভাব না ফেললেও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষেরা বেশ ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে অতীতের বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় দেশ। বিংশ শতাব্দীতেই কয়েকটা ভয়াবহ দুর্যোগের ঘটনা ঘটে। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় সিডর। ১৫-২০ ফুট উচ্চতার প্রবল ঝড়টিতে বাতাসের গতিবেগ ছিল ২২৩ কিলোমিটার। রেডক্রসের হিসাবে সিডরে ১০ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হলেও সরকারিভাবে ছয় হাজার বলা হয়েছিল। ২০০৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আইলা। এতে প্রায় দুশোর মতো প্রাণহানি ঘটে। বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বৈশ্বিক নানা কারাণে পরিবর্তন হচ্ছে আবহাওয়া ও জলবায়ু। ইতোমধ্যে যার প্রভাব সারাবিশ্বেই পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভয়াবহভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা। চরম হুমকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা যে সময়ের মধ্যে আবহাওয়া পরিবর্তনের ধারণা দিয়েছিলেন তারও আগে পরিবর্তন হচ্ছে বৈশ্বিক আবহাওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশ এককভাবে নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে পুরো বিশ্বকেই এগিয়ে আসতে হবে। তবে যে দেশ যতো বেশি সচেতন হবে এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সেই দেশে ততো দেরিতে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্ব্যব্যাপী বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। এতে এসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার লাখ লাখ লোক পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। তারা অবশ্য এ কথাও বলে আশ্বস্ত করেছেন, উন্নত পরিবেশ, দূষণরোধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি লাঘব হতে পারে। ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ৬০ জনের একটি আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল এবং ৮টি এশীয় দেশের সরকার এ জরিপ কার্যক্রম চালায়। ওই জরিপে বলা হয়েছে, উপকূলের ব্যাপক এলাকা সাগরের স্ফীত পানিতে নিমজ্জিত হবে এবং ভূমিধসের সৃষ্টি হবে। মিষ্টি পানির প্রবাহে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করবে। উপকূলীয় ব্যাপক এলাকায় মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকোপও বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণাঞ্চলীয় ৮টি দেশ বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বসবাস করে। বিশ্বব্যাপী বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতির শিকার হবে এই দেশগুলো।
এছাড়াও বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদ পরিচালিত ‘বাংলাদেশে গ্রিন হাউসের প্রভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। গত শতাব্দীর শেষ দিকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা বর্তমানে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এখন আবহাওয়া ঠান্ডা হওয়ার কোনো প্রবণতা নেই বলে গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ বর্তমানের তুলনায় দেশের তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেটার মূলে রয়েছে ‘গ্রিন হাউস এফেক্ট’।
এ বিষয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এটা চলমান অবস্থায় আছে। আমরা যদি দেখি প্রি ইন্ডাস্টিয়াল সময়টাতে বিশেষ করে ১৯৫০ সালের পর যে তাপমাত্রাটা ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রা যাতে না বৃদ্ধি পায় সেজন্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলো কমিটমেন্ট করেছিল। কমিটমেন্টে এটা ছিল যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা যেন না বাড়ে। কিন্তু ২০২৩ সালের মাথায় দেখা যাচ্ছে যে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। সে হিসেবে ২০৫০ সাল নাগাদ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে ধারণা করা হয়েছিল বিশ্বের তাপমাত্রা যদি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায় তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অর্থাৎ বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে আধা মিটার। এতে করে বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৫ ভাগ এলাকা বেশি প্লাবিত হবে। আবার লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, আগামী ৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিস্থিতি আমাদের জন্য সুখকর নয়। যে হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা যদি চলতে থাকে তবে বাংলাদেশের জীববৈচিত্রের জন্য তা হুমকি তৈরি করবে। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল যেমন প্লাবিত হবে, সেই সমস্ত এলাকার মানুষজন যখন নগর অঞ্চলে মাইগ্রেট করবে তখন স্বল্প ভূমির উপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। নগরের পরিবেশ নষ্ট হবে। আমাদের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দ্বীপ অঞ্চল যেগুলা আছে যেমন সেন্টমার্টিন, ভোলা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া এগুলা চরম ক্ষতিগ্রস্থ বা বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এর জন্য বন উজাড়কেই প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হয়। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশকে সুন্দর-সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা অত্যাবশ্যক। সেখানে আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারি হিসাব মতে শতকরা ৯ ভাগ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বনভূমির পরিমাণ ৬ ভাগের বেশি হবে না বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা। দেশে বনভূমির এই অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে গাছ কাটা নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। যদিও পরিবেশবাদীরা এর বিপক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যচ্ছেন তার পরে এই কাজ অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বেশি করে গাছ লাগাতে জোর তাগিদ দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ : বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশের একটি পরিচিত দৃশ্যপট। তীব্রতা ও ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতায় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। প্রায় প্রতিবছরই এ দেশে কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়।
বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, আর্সেনিক দূষণ ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবছরই আমাদের জীবন, সম্পদ ও পরিবেশের বিপুল ক্ষতিসাধন করে থাকে। এর ফলে জনগণ চরম দুর্ভোগ পোহায়, ব্যক্তি ও পরিবারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস হয়, দেশ ও জাতির উন্নয়নের ধারা বিঘ্নিত হয় এবং পরিবেশের দ্রুত অবনতি ঘটে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও সময়মতো পূর্বাগুতি নিয়ে এবং বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কলা-কৌশল ও জনগণের সচেতনতা সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব। এজন্য সরকারসহ দেশের প্রতিটি নাগরিককে দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতন ও সচেষ্ট হতে হবে।
মোট কথা, প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট যে সকল ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে ব্যাহত করে, মানুষের সম্পদ ও পরিবেশের এমনভাবে ক্ষতিসাধন করে যার ফলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হয়, তা-ই দুর্যোগ। আর প্রাকৃতিক কারণে যে সকল দুর্যোগ সংঘটিত হয় সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিধস, ভূমিকম্প, টর্নেডো, অগ্নিকার, মহামারী, নদীভাঙন, আর্সেনিক দূষণ ইত্যাদি ।
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম। প্রায় প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয় বাংলাদেশ। এ দেশের প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প, আর্সেনিক দূষণ ইত্যাদি। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের রূপ অত্যন্ত ভয়াবহ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে। এক হিসাবে দেখা যায়, বিগত ১০০ বছরে এ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৮টি ঘূর্ণিঝড়; ৫০ বছরে ৫৩টি বন্যা, যার মধ্যে ৬টি মহাপ্লাবন: ১৩৫ বছরে সংঘটিত হয়েছে প্রায় ২০টি বড় ধরনের ভূমিকম্প। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৭ সালের জুন পর্যন্ত এ দেশে ছোট ও বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, জে ও কালবৈশাখীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৭টি এবং এর মধ্যে ১৫টি ছিল ভয়াবহ।
এ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ৬ থেকে ৮ লক্ষ এবং প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষরি হয়েছে। বিগত দশকসমূহের মধ্যে ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৪, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮ এবং ১৯৯৬ সালের বন্যা ছিল ভয়াবহ। একইভাবে বিগত বছরসমূহের মধ্যে ১৯৮২, ১৯৮৯ এবং ১৯৯৪ সালের খরায় দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এছাড়া পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিতা ইত্যাদি নী ভাঙনের ফলে দেশের হাজার হাজার লোক গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এ সকল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে অনেকাংশে পিছিয়ে দিয়েছে। নিচে বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা। ভৌগোলিক অবস্থান, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো, অভি বৃষ্টিপাত, একই সময়ে প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি, নদীতে পলল সঞ্চয়ন, পানি নিষ্কাশনে রাধা, ভূমিকম্প নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ইত্যাদি কারণে প্রায় প্রতিবছরই এ দেশে বন্যা হয়ে থাকে। বিগত দশকসমূহের মধে ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৮, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮ ১৯৯৮, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে এ দেশে ভয়াবহ বন্য হয়েছে। বর্তমানে এ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে বন্যা আবির্ভূত হয়েছে।
বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি এত ব্যাপক যে, স্বল্প পরিসরে তা আলোচনা করা কঠিন। বন্যার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কৃষি ফসলের। বন্যায় হাজার হাজার কোটি টাকার ফসলহানি ঘটে। গাছপাল ও ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়। রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস হয়। শহর-বন্দর ডুবে যাওয়ায় ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিপুল ক্ষতি হয়। বন্যার সময় মহামারীসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। বন্যার পানিতে পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করে। এক কথায়, বন্যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও উন্নয়নের ধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
সাধারণত বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে খরা পরিস্থিতি ঘটে থাকে। খরার প্রভাবে খরাপীড়িত এলাকার শস্যাদি পানির অভাবে শুরু হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে এবং গাছপালা শুকিয়ে যেতে থাকে। মাঠের ফসলের জমিতে ফাটল দেখা দেয়। মাটির রস শুকিয়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামতে থাকে। নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-হাওর ইত্যাদিতে অন্যান্য বছরের তুলনায় খরার সময় পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় অথবা সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়।
বাংলাদেশের খরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং অনুসন্ধান করলে নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহ খরার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
পানি প্রত্যাহার। এতে ভূ-উপরিস্থ পানি প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে, ফলে বাষ্পীকরণের পরিমাণ কমছে।
ছ. অপরিকল্পিত ও মাত্রাতিরিক্ত জমি চাষাবাদ। এতে মাটিতে পানি প্রাপ্যতা দিন দিন কমছে এবং প্রাকৃতিক নিয়মে বাষ্পীকরণের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে।
জ . সময়োপযোগী সুষম বৃষ্টির অভাব ইত্যাদি ।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক কারণে পানির চাহিদা অত্যন্ত প্রকট হওয়া সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হয়। আবার গ্রীষ্ম-বর্ষাকালে আশানুরূপ বৃষ্টিপাত না হলে সেচ, কৃষি ফসল উৎপাদনসহ বিভিন্ন পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিদারুণ সংকটসহ দেশে খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়। সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশে যখনই খরা হয় তখন কম বৃষ্টিপাতের কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটে; ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ হ্রাস পায়; খাল-বিল-পুকুর ইত্যাদিতে পূর্বের চেয়ে কম পানি থাকে। এমনকি ভূ-উপরিস্থ অধিকাংশ জলাশয় শুকিয়ে যায় এবং গৃহস্থালী কাজে পানির সংকট দেখা দেয়, উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় । এক কথায়, খরা বাংলাদেশের জনজীবনে ব্যাপক দুর্ভোগ ডেকে আনে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। এ দেশে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে জীবন, সম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় কথাটি এসেছে গ্রিক ‘কাইক্লোস’ শব্দ থেকে। এর অর্থ সাপের কুলী। বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ মতে, সাইক্লোন হচ্ছে নিম্নচাপ উদ্ভূত একটি এলাকা। কোনো অল্প পরিসর স্থানে হঠাৎ বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে বায়ু হালকা হয়ে ওপরে উঠে এবং সেখানে নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয় । তখন চারদিকের শীতল ও ভারী বায়ু প্রবল বেগে ঐ নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে এবং ঘুরতে ঘুরতে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এই কেন্দ্রমুখী প্রবল বায়ুপ্রবাহকেই ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন বল।
ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বা চক্ষুতে বাতাসের চাপ খুব কম থাকায় কেন্দ্রের কাছাকাছি অঞ্চলে সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে। একেই জলোচ্ছ্বাস বলে। কোনো দ্বীপাঞ্চল বা উপকূল দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাওয়ার সময় ঝড়ের ঢেউ ও জোয়ার এসে প্লাবন ঘটায়। তারপর ঝড়ের চক্ষু যদি সে স্থান দিয়ে অতিক্রম করে তবে ঝড়ের ঢেউ, ঝড়ের জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস এই তিনটির সমন্বয়ে ঐ স্থানের বিরাট অংশ ডুবে যায়। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার ভরা কটালের সময় যদি জলোচ্ছ্বাস হয়, তবে তার ফল আরো মারাত্মক হয় ।
বাংলাদেশ মৌসুমী বায়ুর দেশ। এখানে মৌসুমী ঘূর্ণিঝড় বেশি হয়। সাধারণত বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে ইংরেজি এপ্রিল-মে মাসে, বর্ষা মৌসুমের শেষে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে গড়ে ১৩-১৪টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ৪-৫টি ঘূর্ণিঝড়ের যে কোনোটির বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানার সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বেশি আঘাত হানে। এই উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো হচ্ছে সাতক্ষীরা ,খুলনা ,বাগেরহাট, পিরোজপুর ,বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, চাদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশে নিয়মিত আঘাত হানে এবং এর কোনো কোনোটি খুবই মারাত্মক হয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৯টি ঘূর্ণিঝড় ও ভালোচ্ছাস বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ও পশুপাখি নিহত হয়েছে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ পিনষ্ট হয়েছে। প্রাকৃতিক বন সুন্দরবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রচুর বৃক্ষসম্পদ ধ্বংস হয়, বন্যপ্রাণী ও গবাদিপশু মারা যায়, ব্যাপক আবাসি জমিতে লোনাপানি ঢুকে পড়ে, ফলে বিপুল পরিমাণ ফসল ধ্বংস হয়। মানুষের ঘরবাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক কথায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারায় অপরিসীম ক্ষতিসাধন করে।
কালবৈশাখী বাংলাদেশের আরেকটি নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কালবৈশাখী প্রি এ দেশে আঘাত হানে । সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে কালবৈশাখীর প্রচণ্ড থাবা শুরু হয়। এ সময় হঠ দেখা যায় দুপুরের পর আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রচণ্ড বেগে ঝড় বইতে থাকে ৷ এর সঙ্গে শুরু হয় বজ্র বিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত, কখনো বা শিলাবৃষ্টি। কালবৈশাখীতে বনজসম্পদ, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল, জীবন ও অন্যান্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
সীমিত ভৌগোলিক আয়তনের এই বাংলাদেশে নদীভাঙন একটি মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশের প্রায় সব অঞ্চলে কম-বেশি নদীভাঙন চলছে। নদীর পানির প্রবাহপথ সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়া এবং নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণে দেশের প্রায় সকল প্রধান নদীতে ভাঙন চলছে। প্রতিবছর বিশেষ করে বন্যা মৌসুম ও সন্নিহিত সময়ে নদীভাঙন বাংলাদেশের প্রায় ৪০টি প্রধান ও অপ্রধান নদীতে অবধারিত ঘটনা হিসেবে দেখা দেয়।
নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি অপরিসীম। এর আর্থ-সামাজিক প্রতিক্রিয়াও অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ। নদীভাঙনের ফলে প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদীভাঙনজনিত প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে। ফলে কেবল জীবননাশই নয়, বসতবাড়ি, গোসম্পদ, গাছপালা, মূল্যবান চাষযোগ্য জমি এবং অন্যান্য পারিবারিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও নদীভাঙনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া আরে দীর্ঘমেয়াদি। নদীভাঙনের ফলে অনেক পরিবার তাদের সামাজিক মান মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মান রক্ষায় বিপর্যস্ত হচ্ছে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের মাঝে অনেকের লেখাপড়া, ব্যবসায়-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেকের পেশাগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।
নদীভাঙন এলাকায় দেখা গেছে যে, অনেক পরিবারের সদস্য জীবিকার তাগিদে ক্রমান্বয়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। নদীভাঙনের ফলে বহু লোক ভূমিহীন, বায়ুহারা ও ছিন্নমূল হয়েছে। অপরদিকে নদীভাঙনের ফলে গৃহহীন মানুষের শহরমুখী অপরিকল্পিত অভিগমন দেশে সুস্থ নগরায়ন ধারায় মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এক কথায় বলা যায়, নদীভাঙন বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারায় অপরিসীম ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্পও বহু শতাব্দী ধরে বাংলাদেশে আঘাত হানছে। ভূতাত্ত্বিকরা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পার্বত চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর এই এলাকার আওতাভুক্ত।
সাধারণত কঠিন ভূত্বকের কখনো কখনো হঠাৎ কেঁপে ওঠাকে বলা হয় ভূমিকম্প। কয়েকটি প্রধান কারণে ভূমিকম্প হয়ে থাকে। যেমন—
ক. কোনো কারণে পৃথিবীর অভ্যন্তরে শিলাচ্যুতি ঘটলে তাপ বিকিরণের ফলে ভূগর্ভ সঙ্কুচিত হয়ে তৃত্বকে ভাঁজের সৃষ্টি হলে ভূমিকম্প হয়।
খ. ভূগর্ভে হঠাৎ চাপ হ্রাস পেয়ে পৃথিবীর মধ্যকার পদার্থ কঠিন অবস্থা থেকে তরল অবস্থায় পরিণত হয় এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় লাভা বের হওয়ার ফলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে।
গ. প্লেট মুভমেন্টের কারণে ভূমিকম্প হয়ে থাকে। ভূত্বক কতগুলো প্লেট দ্বারা নির্মিত। এসব প্লেটের ভূতাত্ত্বিক নাম ‘টেকটোনিক প্লেট’। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য সাবপ্লট। এগুলো সবসময় সঞ্চরণশীল। প্লেটগুলো চলতে চলতে কখনো যদি একটি অন্যটিকে অতিক্রম করে ফেলে কিংবা একটি অন্যটির ওপরে চড়ে বসে তখন ভূমিকম্প হয়।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও ব্যাপক ভূমিকম্পের ফলে বাড়িঘর, দালানকোঠা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, গাছপালা ভেঙে পড়ে, নদীর পাড় ভেঙে পড়ে, নদীর বাঁধ-জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে, মাটিতে ফাটল দেখা দেয়, পাহাড়ে ধস নামে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। সর্বোপরি এর ফলে জীবন ও সম্পদের অপরিসীম ক্ষতি হয়
বাংলাদেশ বর্তমানে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিককালে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সংঘটিত ভূমিকম্প একটি বড় ধরনের ভূমিকম্পেরই পূর্বাভাস দিচ্ছে। অতীতে বাংলাদেশে প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৬০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টি উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৭৬২ সালে বাংলাদেশে যে ভূমিকম্প হয় তাতে মধুপুরের গড় ও সিলেটের হাওর সৃষ্টি হয় বলে ধারণা করা হয়।
১৭৮৭ সালের ভূমিকম্পে তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ১৮৮৭ সালের ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। এছাড়াও ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প, ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গলের ভূমিকম্প এবং ১৯৩০ সালের ধুবরীর ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মৃদু ভূমিকম্প হয় ।
জাতিসংঘ প্রণীত ‘ভূমিকম্প বিপর্যয়ের ঝুঁকি সূচকে (আর্থকোয়েক ডিজাস্টার রিঙ্ক ইনডেক্স, সংক্ষেপে ইডিআরআই) পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে ঢাকা শহর। এর একমাত্র কারণ এখানকার বাড়িঘরের নিম্নমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ ইনটেনসিটি যদি ঢাকায় অনুভূত হয়, তাহলে এখানকার প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িঘর বিধ্বস্ত হবে। প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হবে আর অজস্র প্রাণহানি ঘটবে । তাই এ ব্যাপারে এখনই সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। নানা কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ । প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশকে অগ্রগতির ধারা থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বারা প্রতি বছরই এ দেশের জনগণের জান-মাল, সহায়-সম্পত্তি, প্রকৃতি ও পরিবেশের বিপুল ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
যদিও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কখনো স্তব্ধ করা যাবে না, তবুও পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের মতো এ দেশেও পরিকল্পিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার দ্বারা এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য সরকারকে যেমন দুর্যোগ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি দেশের জনগণকেও সচেতন হয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় অধিকতর সচেষ্ট হতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রকৃতিতে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ, নদী শাসন ইত্যাদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিভিন্ন প্রভাবজনিত কারণে দুর্যোগে বাংলাদেশের বিপদাপন্নতা কয়েকগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোতে যেমন জানমালের ক্ষতি হয়েছে, তেমন অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে; যা বাংলাদেশকে তার উন্নয়ন অগ্রযাত্রা থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আবহমানকাল ধরে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয়ে আসছে। এসব ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, কালবৈশাখি, টর্নেডো, নদী ভাঙন, উপকূল ভাঙন ও খরা ইত্যাদি। ইউরিশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেটের মাঝামাঝি হওয়ায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। এছাড়াও বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং দারিদ্র্য ও ঘনবসতির দরুন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি ভয়াবহ। ‘ওয়ার্ল্ড রিস্ক রিপোর্ট ২০১১’ অনুযায়ী-দুর্যোগের ঝুঁকি এবং বিপদাপন্নতার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ৬ষ্ঠ ও ১৫তম।
এমতাবস্থায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দিবসটি উপলক্ষ্যে মিডিয়া অ্যাডভোকেসি সভার আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী উন্নয়ন ও সমাজসেবাসমূলক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি সংস্থা লাইট হাউজ।
অনলাইন প্লাটফর্ম জুমে ইউএসএআইডি সুখী জীবন প্রকল্প, পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় সভার আয়োজন করে লাইট হাউস। ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২৫ উদযাপনের অংশ হিসেবে মিডিয়া অ্যাডভোকেসি সভায় লাইট হাউসের নির্বাহী প্রধান মো. হারুন অর রশিদের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাকের ক্লাইমেট চেঞ্জ ফান্ডের প্রধান গোলাম রাব্বানী এবং বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সম্পাদক ফোরামের সদস্য সচিব ও দৈনিক আজকালের খবরের সম্পাদক ফারুক আহমেদ তালুকদার, নাহাবের সমন্বয়কারী মো. রওশন ও সিনিয়র সাংবাদিক শফিকুল ইসলামসহ লাইট হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
সভায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লাইট হাউজের নির্বাহী প্রধান মো. হারুন আর রশিদ। তিনি জানান, দুর্যোগের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি মানুষের জীবন ও সম্মানজনক জীবিকা অর্জনের পথে এক বিশাল অন্তরায়। বিশেষ করে দরিদ্র সম্প্রদায়ের জন্য, যারা অত্যন্ত কষ্টার্জিত উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। দুর্যোগের ফলে কেবল দুর্যোগ কবলিত দেশ বা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন নয়, বরং এর ফলে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পরিবর্তিত প্রযুক্তি, আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ ও ভৌগোলিক বিপর্যয়, জলবায়ুর পরিবর্তন, এইচআইভি-এইডসের প্রকোপ, ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয় ও ক্রমবর্ধমান হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের ঝুঁকি তীব্রতর করে তুলেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT