শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ফকিরহাটে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স প্রতিযোগিতার উদ্বোধন সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ যশোরে দুই মাদক ও অস্ত্র মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবনসহ ১৭ বছরের কারাদণ্ড যশোরে দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শরণখোলায় কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার তালায় খাঁচায় আটকে গুরুতর আহত বনবিড়ালের বাচ্চা উদ্ধার ডুমুরিয়ায় দুর্বৃত্তের দেয়া বিষে ৫ লক্ষ টাকার মাছ নিধন খুলনাকে আবারও শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উজিরপুরে ব্যাপক আয়োজনে নতুন কুঁড়ি শুভ উদ্বোধন ​উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন

উপকূলীয় নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবে নারী পরিষদ

  • প্রকাশিত সময় : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৩ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সর্বত্র। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে বাংলাদেশ নামক ব—দ্বীপ রয়েছে সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে। বিশেষ করে দেশের নিম্ন অঞ্চল গুলো পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহতায় প্রতিবছর কবলিত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বর্তমান সরকার উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের সবচেয়ে বেশি মাশুল দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ আন্দোলন নিয়মিত কাজ করলেও নারী ও শিশুদের জন্য প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করতে সহযোগী সংগঠন হিসেবে  নারী পরিষদে গতকাল ২৬ আগষ্ট শনিবার ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন সবুজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান বাপ্পি সরদার এবং মহাসচিব মহসিন সিকদার পাভেল। সবুজ আন্দোলন পরিচালনা পরিষদের অর্থ পরিচালক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নিলুফার ইয়াসমিন রুপাকে সভাপতি এবং সাহিন আরা সুলতানাকে সাধারণ সম্পাদক করে উক্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়।

নবগঠিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার অভিমত ব্যক্ত করেন। উপকূলীয় অঞ্চল সহ সারা দেশে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে নারীদের মাঝে জনসচেতনতা তৈরিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সব আছে সেমিনার আয়োজনের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি আয়োজনের জন্য কাজ করবেন বলে জানান। নবগঠিত কমিটির অন্যান্যরা হলেন, সহ—সভাপতি ডা. সাকিরা নোভা (ঢাকা), দিনা আমিন (নারায়ণগঞ্জ), সেলিনা চৌধুরী (ঢাকা), শিলা মহসিন (ঢাকা), অধ্যাপক আক্তার বানু আলপনা (রাজশাহী), রোকসানা আইভি (বরিশাল), নাসরিন রহমান ফাতেমা (ময়মনসিংহ), কবি সৈয়দা হাবিবা মুস্তারিন (ঢাকা), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবিহা জামান শাপলা (ময়মনসিং বিভাগ), রিতু আক্তার (রংপুর বিভাগ), কাজী ফাবিয়া আক্তার ক্ষমা (ঢাকা বিভাগ), এ্যাড. আছিয়া মাহজাবিন খান নিশু (কুমিল্লা), নয়ন সেলিনা (কক্সবাজার), সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাড. সৈয়দা ফারহান আক্তার ডিউ (ঢাকা মহানগর), তাসলিমা আক্তার শিমুল (বরিশাল বিভাগ), আঞ্জুমান আরা সাম্য (ঢাকা বিভাগ), মোছা: রাহেলা আক্তার (সিলেট বিভাগ), চন্দনা আহমেদ (রংপুর বিভাগ), সহ—সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট কাজী রুনা লায়লা (নরসিংদী), মমতাজ বেগম (ময়মনসিংহ), আলেয়া আক্তার হীরা (ঢাকা), অর্থ সম্পাদক মিতু রায় (সিলেট), সহ—অর্থ সম্পাদক সালমা আক্তার শান্তা (ঢাকা), হেলেনা জান্নাত মিলি (ঢাকা), দপ্তর সম্পাদক রিয়া আক্তার (ঢাকা), সহ—দপ্তর সম্পাদক ফারজানা আফর (ঢাকা), প্রচার সম্পাদক শামীমা রহমান (ঢাকা), সহ—প্রচার সম্পাদক শারমিন সুলতানা (রাজশাহী), মাসুমা আক্তার বৃষ্টি (সুনামগঞ্জ), আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাবেয়া খাতুন সুমি (ঢাকা), শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক প্রভাষক তাহের আলী রুমা (পটুয়াখালী), সহ—শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক শারমিন আক্তার জুই (রাজশাহী), নাসরিন আক্তার আইরিন (ঢাকা), আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক কবি হাফছা নূর (ইংল্যান্ড), সহ—আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোছাঃ সাবিহা আনসারী (রংপুর), স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ইসমত আরা পারভীন (ঢাকা), সহ—স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. শামিমা সোমা (ঢাকা), তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ফারহানা হক নীলা (ঢাকা), সহ—তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক চৈতী দাস (পটুয়াখালী), ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মাকসুদা (রাজশাহী), সহ—ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মিতা ভূঁইয়া (মৌলভীবাজার), বনায়ন বিষয়ক সম্পাদক কবি রোকসানা মহুয়া (ঢাকা), সহবনায়ন বিষয়ক সম্পাদক সুমি আক্তার (মাদারীপুর), সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক সংগীতশিল্পী রোজিনা আক্তার (ঢাকা), সহ—সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক কবি সুলেখা আক্তার (ঢাকা), কবি সেলিনা সাথী (নীলফামারী), নির্বাহী সদস্য আকতারী বেগম মিনা (ঢাকা), কামরুন নাহার নিলু (সীতাকুণ্ড), মিস কাকলি (বরিশাল)।মাঠ পর্যায়ে নারীবাদী আন্দোলনকে বোঝা বা বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন একটা কাজ। কারণ আমরা যে সমাজ কাঠামোয় বসবাস করি সেখানে গ্রামাঞ্চলে বা তৃণমূল স্তরে নারীবাদ বা নারী এবং পুরুষের সমতা ও সমঅধিকার, নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ইত্যাদি নিয়ে যে কাজগুলো হচ্ছে, যে পরিবর্তন আসছে সেগুলো ঘটছে নিরবে, নিভৃতে। এগুলোর গতিপ্রকৃতি শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের মাধ্যমে পরিচালিত মূলধারার নারীবাদী আন্দোলনের মতো দৃশ্যমান ও প্রতিবাদী চরিত্রের নয়।
নারীবাদ শব্দটা শুনলেই একটি সম্মিলিত আন্দোলনের কথা মনে হয়। যেখানে নারীর সমঅধিকারের পক্ষে মানুষ কথা বলছে; বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন বা নীতির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলছে; মিটিং, মিছিল, সভা-সেমিনার করছে; সরকার বা সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে এ্যাডভোকেসি বা লবিং করছে ইত্যাদি। এ ধরনের নারীবাদী কার্যক্রম বা উদ্যোগ গ্রামাঞ্চলে বা প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে এখনও তেমন দেখা যায় না।
আমরা অনেকেই হয়তো দক্ষিণ ভারতের নিম্নবর্ণের নারী নাঙ্গালীর কথা জানি। প্রায় ২০০ বছর আগে ভারতের কিছু অঙ্গরাজ্যে স্তন কর বলে এক ধরণের কর প্রচলিত ছিল। সেখানে নিয়ম ছিল ব্রাক্ষণ বাদে অন্য হিন্দু নারীরা স্তন ঢাকতে পারবে না। কেউ ঢাকতে চাইলে তাকে তার জন্য স্তন কর দিতে হবে। নাঙ্গালী এই নিয়মের বিরোধীতা করে বস্ত্রখণ্ড দিয়ে তাঁর স্তন ঢাকেন এবং স্তন কর দিতে অস্বীকৃতি জানান। কর আদায়ের জন্য তাঁর বাড়িতে রাজার ট্যাক্স কালেকটর হাজির হন। নাঙ্গালী তখন ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের দুটো স্তন কেটে সেগুলো ট্যাক্স কালেকটরের হাতে তুলে দেন। এর কিছুক্ষণ পর ক্ষতস্থান থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে তিনি মারা যান। এই ঘটনার পর বন্ধ করে দেয়া হয় স্তন কর প্রথা।
তবে কর বন্ধ হলেও স্তন আবৃত করার জন্য ঐ অঞ্চলের নারীদের বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করার মতো এত সাহস, জেদ বা সচেতনতা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মাঠ পর্যায়ে এখনও অনুপস্থিত বললেই চলে। অবশ্য এটাও ঠিক যে নাঙ্গালীর মতো নারীরা তৃণমূল, নিম্নবিত্ত বা নিম্নবর্ণের পরিবারে বহু যুগ পরপর জন্মায়।
আসলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যে গোঁড়া গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা সেখানে তৃণমূলের কেউ নারীবাদী হবেন বা পুরুষ ও নারীর সমঅধিকার বা সমতার জন্য স্বশরীরে মাঠে নেমে কাজ করবেন এটা এখনও প্রায় অসম্ভব। নারীকে অধস্তন মনে করা; বাড়ির বউকে নির্যাতন করা; বাল্যবিয়ে দেয়া; যৌতুক নেয়া; নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে না দেয়া; ঘরের কাজ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান লালন-পালনকে তাদের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করা; ইত্যাদি অসংখ্য বৈষম্য এবং নিপীড়নমূলক ধারণা এবং প্রথা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনাচারকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সেগুলোর শেকড় এতো গভীর যে মানসিকতা এবং সমাজ ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন হওয়ার পরও এসব ধারণা বা প্রথার মধ্যে ভুল, অন্যায় বা অনৈতিকতা কোথায়, সেটা স্থানীয় জনগোষ্ঠী এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। ফলে সচেতনতাই যেখানে পুরোপুরি তৈরি হয়নি, সেখানে তৃণমূল মানুষের স্বউদ্যোগে নারীবাদী আন্দোলন হবে কোথা থেকে?
তাই বলা যায় যে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমতা ও নারীর সমঅধিকার অর্জনের কার্যক্রম ধীর গতিতে অগ্রসরমান। এখনও তাদেরকে নিজের অধিকার, যোগ্যতা, স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করার এবং সেগুলো দাবি করার জন্য প্রস্তুত করার কাজটি চলমান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সরকার এবং বেসরকারি সংস্থা এই কাজগুলো পরিচালনা করছে। তারা প্রান্তিক নারীদের অবস্থার পরিবর্তন করতে, তাদের মূলধারার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংযুক্ত করতে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক নারীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়া; তাদের অনুদান দেয়া বা প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা; সমাজে জেন্ডার সচেতনতা তৈরি; বাল্য বিয়ে ও যৌতুক বিরোধী আইন প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়ন; নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিরোধে নানামুখি উদ্যোগ ইত্যাদি। এছাড়াও বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম, আইনি সহায়তা প্রদান কার্যক্রম, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত বিভিন্ন কমিটিতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি পরিচালনা, বাল্য বিয়ে, নারী নির্যাতন রোধ ইত্যাদি কার্যক্রম তৃণমূল নারীদের ক্ষমতায়িত হতে, বিশেষ করে তাদের পরিবারে নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে একদিকে প্রান্তিক নারীরা আস্তে আস্তে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত হচ্ছেন। একই সাথে যেন একটা সময় প্রান্তিক নারীরা নিজেদের অধিকার নিজেরাই দাবি করতে পারেন, তারা যেন বৈষম্যমূলক গ্রামীণ সমাজকাঠামোর বিপক্ষে দাঁড়াতে পারেন সেরকম পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় ডোনারদের সহায়তা রয়েছে। পাশাপাশি কর্পোরেট রেসপন্সিবিলিটির অংশ হিসেবে অনেক কর্পোরেট হাউস এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও এখন প্রান্তিক নারীদের অবস্থার পরিবর্তনে বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বাংলাদেশে গ্রামীণ নারীদের অবস্থার পরিবর্তনে নিঃসন্দেহে বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেসরকারি সংস্থার বেশ ইন্টারেস্টিং একটা অবদান আমাদের চোখ এড়িয়ে গেছে। তা হলো বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের মূলধারার ক্যারিয়ারের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ক্রেডিট কিন্তু বেসরকারি সংস্থার উপরেই বর্তায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যখন দেশ জুড়ে একটু একটু করে উন্নয়ন কার্যক্রমের বিস্তার শুরু করে তখন থেকে তারা তৃণমূলে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিয়োগ দিতে শুরু করে নারী কর্মীদের। একটু চিন্তা করে দেখুন। যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি দেশ। রাস্তাঘাট নেই। যা আছে সেগুলো যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত। এ রকম একটা অবস্থায় বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে গিয়ে মায়েদের ঘরোয়া পদ্ধতিতে খাবার স্যালাইন বানানোর পদ্ধতি শিখিয়েছেন বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের নারী কর্মীরা। এই কাজের জন্য তাঁরা পায়ে হেঁটে বা নৌকায় দূরদূরান্তে গেছেন। সে সময়কার গোঁড়া সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে সে এক অভাবনীয় ঘটনাই বটে। তাদের এই কাজটির কারণে দেশব্যাপী ঘরে বানানো স্যালাইনের ব্যবহার শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে ডায়রিয়ায় শিশু মৃত্যুর হার লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়।
পরবর্তীতে দেশ জুড়ে বেসরকারি সংস্থার কাজ যত প্রসারিত হতে থাকে তত নারী উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ে। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে নারী কর্মীর সংখ্যাও। এই কর্মীদের বড় অংশই স্বল্প শিক্ষিত বা ট্রেনিং প্রাপ্ত গ্রামীণ নারী। এমন একটা সময় ছিল যখন এই নারী কর্মীদের মেঠোপথে সাইকেল বা মটরবাইক চালিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় গ্রামের মানুষের কটু কথা শুনতে হতো৷ বেসরকারি সংস্থা গ্রামের বউদের বাড়ির বাইরে নিয়ে এসে তাদের বেয়াদব বানিয়ে ফেলছে, উল্টাপাল্টা কথা শিখিয়ে শশুরবাড়ির লোক বা স্বামীর মুখেমুখে কথা বলতে শেখাচ্ছে – এসব কথা শুধু বেসরকারি সংস্থার উপকারভোগী নারীদের নয়, বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত নারী কর্মীদেরও পদে পদে শুনতে হয়েছে। এখনও শুনতে হয়।
গ্রামের বা তৃণমূলের নারীরা হয়ত নারীবাদ শব্দটার অর্থ ভালো করে জানেন না। তাদের অনেক বড় অংশ পুরুষতন্ত্র, নারী ও পুরুষের সমঅধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন – এসব বড় বড় টার্মের সঙ্গে পরিচিত নন। কিন্তু গ্রামের যে কিশোরীটি তার বাল্য বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পেরেছে, বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় স্বাবলম্বী হওয়া যে নারী আজকে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার হয়েছেন, যে উন্নয়নকর্মী নারী আজকে তাঁর সংস্থার কোন শাখা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, তাদের প্রত্যেকের গল্পগুলো যদি শোনা যায়, তাহলে উপলব্ধি করা যাবে কতটা সাহস আর দৃঢ়তার সঙ্গে পরিবার এবং সমাজের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রবল লড়াই করেছেন।
এ কথা সত্য যে মাঠ পর্যায়ে নারীর অবস্থার যে পরিবর্তন এখন পর্যন্ত হয়েছে তা মূলত পরিবার কেন্দ্রিক। অর্থাৎ পরিবারে নারীর অবস্থানের উন্নয়ন হচ্ছে। অর্থনৈতিক অবদান রাখার সুযোগ বাড়ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুরো গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় এখনও নারীকে অধস্তন হিসেবেই দেখা হয়। প্রান্তিক নারীর এখনও বাজারে অভিগম্যতা নেই, সমাজপতিরা তাদের কথা শোনেন না, গ্রাম সালিশিতে বা ইউনিয়ন পরিষদের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের মতের গুরুত্ব দেয়া হয় না। তারপরও যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা মোটেও নগণ্য নয়, বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নারীর সমঅধিকার এবং নারী ও পুরুষের সমতা অর্জনের এই অভিযাত্রাকে তাই পরিবারের গণ্ডি থেকে বের করে সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ছড়িয়ে দিতে এখন সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহকে কাজ করে যেতে হবে। এটাই তৃণমূল নারীর অগ্রযাত্রাকে সচল রাখতে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক ঘটনা, যা বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর উপর দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনে প্রভাব রাখে। এই পরিবর্তন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা এবং বাস্তুতন্ত্র উভয়কেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে বহু প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এছাড়া মানবজাতির জন্যও এই পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
যদিও জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের সকলের জন্য হুমকিস্বরূপ, তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে এর কারণে নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে আছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের ৮০% নারী। দীর্ঘস্থায়ী খরা, স্বল্প খাদ্য উৎপাদন, এবং বৈরী আবহাওয়ার অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব নারীদের উপরই বেশি পড়ে। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেখানে ১৫০ কোটিরও বেশি নারী প্রতিদিন ১ ডলারেরও কম আয় করেন। বিশ্বব্যাপী, ২৫-৩৪ বছর বয়সী নারীদের চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করার সম্ভাবনা পুরুষদের তুলনায় ২৫% বেশি।
বিশ্বের বেশিরভাগ নারীকে এই জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আরও সংবেদনশীল করে তোলে। নারীরা পানি, খাদ্য, এবং জ্বালানির প্রাথমিক সংগ্রাহক। তাদের কেউ কেউ কৃষিকাজ করেও জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া পুরুষতান্ত্রিক বৈশ্বিক হালে বাসায় বাচ্চাদের যত্ন, এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বও তাদের উপর। এই দায়িত্বগুলোতে পরিবেশগত অবক্ষয় এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক তাপমাত্রার প্রভাব অনুভব করার প্রবণতা বেশি। কারণ তারা প্রাকৃতিক সম্পদের উপর খুব বেশি নির্ভর করেন। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর নারীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয়। ভবিষ্যতে, এটি ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে, নারী ও মেয়েরা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হলেও, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধানের উপায় এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বও দিচ্ছেন। এছাড়া বিশ্বব্যাপী জলবায়ু নিয়ে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, সেখানেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। গবেষণায় দেখা যায়, এই ভূমিকাগুলোর মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন দারিদ্র্যকে পরিবর্তন করতে পারে এবং জলবায়ু সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে।বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি নারী জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, এবং ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতির শিকার হবেন। কিন্তু তারা জানেন না যে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে প্রায় ২৫ হাজারের অধিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে একটি বিশাল সম্মেলন হচ্ছে, ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনার উদ্দেশে।
এই সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা গেছেন। বিশেষ করে ধনী দেশের সরকারগুলোর প্রধানরা উপস্থিত হয়েছেন মুখে মাস্ক পরে; তারা হাত মেলাচ্ছেন না, কনুই মেলাচ্ছেন।
তাদের সেই মাস্ক ঢাকা মুখের দিকেই চেয়ে আছে সকলে। সবাই দেখতে চায়, তারা তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে ২০৪০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের পরিমান কমাবার প্রতিশ্রুতি দেন কি না। তারাই বিশ্বের ৮০% কার্বন নিঃসরণের জন্যে দায়ী, অথচ ভুক্তভোগী হচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষ।
আইপিসিসি বা আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তনের প্যানেল বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সর্বশেষ আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে মানুষ সৃষ্ট কারণে বায়ুতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ বেড়ে গেছে, যার কারণে আমরা অসময়ের বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরাসহ নানা ধরনের অস্বাভাবিক আবহাওয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আইপিসিসির প্রতিবেদনের কথাও আমাদের দেশের লক্ষ-কোটি নারী জানেন না, তাদের জানার কথাও নয়। কিন্তু না জানলেও বন্যা, তাপমাত্রার বৃদ্ধি, খরার যে কষ্ট তা তারা অনুভব করছেন, সেই কথাই এই প্রতিবেদনে আছে।
জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নারীর ওপর ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি এবং ভিন্ন মাত্রার। এই সত্য আজ এশিয়া, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর প্রায় সব ভুক্তভোগী দেশে প্রতিষ্ঠিত। সে কারণে গ্লাসগোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও নারী শীর্ষক বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়েছে।
এসব অনুষ্ঠানের একটিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করেছেন। আরও ছিলেন এস্তোনিয়া ও আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক। এখানে নারী সরকার প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তাই বাংলাদেশ সেই সুযোগ পেয়েছে।
নারীদের প্রসঙ্গে আলোচনায় যা উঠে আসছে তা হচ্ছে : নারীর সামাজিক ও পারিবারিক অসম অবস্থান, বৈষম্য, নির্যাতনের যে অবস্থা বিদ্যমান তার সাথে জলবায়ু বিপর্যয় নারীর জীবনকে আরও দুর্বিসহ করে তুলছে।
গ্লাসগো ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীর বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানি, স্যানিটেশন, মর্যাদাপূর্ণ কাজের অধিকারসহ নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে বলে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এই ঘোষণার দুর্বল দিকও আছে। সেটা হচ্ছে : যারা এই জলবায়ূ বিপর্যয় ঘটাচ্ছে তাদের চিহ্নিত করা হয়নি। এই অবস্থা পরিবর্তনে তাদের দায়িত্ব কী, সেটা না বলে শুধু নারীদের জন্যে অনেক কিছু করার কথা ফাঁকা বুলি হয়ে থাকার সম্ভাবনা প্রচুর।
তাছাড়া জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্যে যেসব রাষ্ট্র দায়ী তাদের সরকার প্রধানরা সবাই পুরুষ হবার কারণে এই সভায় আমন্ত্রিত ছিলেন না। ফলে তাদের কোন দায় নেই।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস নারী, কিন্তু জলবায়ূ সম্মেলনে তাকে দেখা যাচ্ছে না। অন্যান্য ধনী দেশের উচ্চ পদস্থ কোন নারী উপস্থিত ছিলেন কি না, তা-ও জানা যায় নি।
তাহলে নারীদের জন্যে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তার কোনো আশ্বাস এখান থেকে পাওয়া যাবে না। নারী যেন জলবায়ু বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায় সেই ব্যবস্থা নেয়ার দায় কার, সেটা স্পষ্ট নয়।
‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বললে সার্বিক ক্ষতির অবস্থা বোঝার বিষয়টির গুরুত্ব একটু কমে যায়। আসলে যা ঘটছে তা পরিবর্তন নয়, পরিবর্তন সব
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে আমরা নারীদের পদক্ষেপ নেয়ার উদাহরণ দেখতে পাই।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার নারীরা পরিবারের জন্য ঝড় ও বন্যা প্রতিরোধী আবাসন ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
হারিকেন মারিয়া পুয়ের্তো রিকোতে আছড়ে পড়ার পর স্থপতি কার্লা গৌটিয়ার (Carla Gautier) তার বন্ধু মারিয়া গ্যাব্রিয়েলা ভেলাসকো (Maria Gabriela Velasco) এক হন। তারা শিপিং কনটেইনারগুলোকে একত্রিত করে দ্বীপ জুড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া তিন লক্ষাধিক বাড়ি পুনর্নির্মাণ করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বকে জানানোর জন্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের স্থানীয় নারীরা ফিজিতে মিডিয়া নেটওয়ার্ক এবং মনিটরিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেছে।
গ্রামীণ সুদানের একদল নারী সেখানকার খরা ও দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন মানুষদের খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতির জন্য প্রথম নারী কৃষক ইউনিয়ন গঠন করেছে।
নিকারাগুয়ায় হারিকেন তীব্রতর আর প্রবল হয়ে ওঠার কারণে সেখানকার আদিবাসী মহিলারা এগিয়ে আসে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বীজ ব্যাংক তৈরি করতে অনুপ্রাণিত হয়।
এ থেকে বোঝা যায়- নারীরা দুর্যোগ পরিকল্পনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ বা ক্ষমতা পেলে, তারা অসাধারণ জ্ঞান এবং দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে।
নারীরা সামাজিক ও পরিবেশগত আন্দোলনের প্রধান নেতা হিসেবে পদক্ষেপ নিয়েছে। যখন ‘ডাকোটা এক্সেস পাইপলাইন’ কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাকোটা রাজ্যের স্থানীয় জনগণের জমিতে তেলের পাইপলাইন স্থাপন করতে যায়, তখন লাডোনা ব্রেভ বুল অ্যালার্ড এর নির্মাণের বিরোধিতা করেন। তিনি এর বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আন্দোলন শুরু করেন। ২০২০ এর জুলাই মাসে, রাজ্যের ফেডারেল বিচারক সিউক্সের উপজাতির পক্ষে রায় দেন এবং পরিবেশের উপর এই পাইপলাইনের প্রভাব বিশ্লেষণের আদেশ দেন। ফলশ্রুতিতে ২০২১ সালে পাইপলাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়।
কেনিয়াকে মরুকরণের হাত থাকে বাঁচাতে এবং তার সম্প্রদায়ের নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ওয়াঙ্গারি মাথাই ছয় হাজার গাছের নার্সারি তৈরি করেছেন। তার এই কাজ আফ্রিকান-নেতৃত্বাধীন ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে, যার লক্ষ্য সাহেলজুড়ে ৮,০০০ কি.মি. বৃক্ষের বেষ্টনী তৈরি করা। আশা করা যায়- এটি বিপুল পরিমাণে কার্বন গ্রহণ ও পরিশোধন করার পাশাপাশি জনজীবনকে পরিবর্তন করবে।
যখন ইকুয়েডরের সরকার আমাজনের আদিবাসীদের সাত মিলিয়ন একর জমি তেল কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে যাচ্ছিল, তখন আদিবাসী নারী নেমন্টে নেনকুইমো একটি সম্প্রদায়িক মামলার নেতৃত্ব দেন। আদালত ওয়াওরানি জনগণের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে তেল উত্তোলন থেকে জমি রক্ষা পেয়েছে এবং পরবর্তী নিলামের আগে তাদের কাছ থেকে সম্মতি নেয়া বাধ্যতামূলক করেছে।
হন্ডুরাসে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ তৈরি প্রতিষ্ঠান আগা জারকা গুয়ালকার্ক নদীতে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। নদীটি ছিল লেনকা জনগণের কাছে পবিত্র, আর বাঁধ নির্মাণের ফলে তাদের পানি, খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে, এবং এটি পরিবেশেরও নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বার্টা ক্যাসেরেস সেখানকার জনগণকে নিয়ে তৃণমূল প্রচারণা চালান, যার ফলে প্রকল্পটি সফলভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া এটি আদিবাসীদের অধিকার নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন ছিল বলেও প্রমাণিত হয়।
কোভিড-১৯ এ নারী নেতৃত্বে ক্ষমতায় থাকা দেশগুলো অন্যান্যদের তুলনায় বেশি সাফল্য দেখিয়েছে। ১৯৪টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, নারীদের নেতৃত্বে দেশগুলোতে মহামারীর বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপগুলো পদ্ধতিগতভাবে ভাল ছিল। এটি আরও দেখায় যে, নারী সরকারপ্রধান দেশগুলোতে কোভিড-১৯ এর মৃত্যুহারও কম ছিল। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি উদ্ভাবনী এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিশ্বজুড়ে ১৭টি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নারীদের উপস্থিতির ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সংরক্ষণে কঠোর এবং আরও টেকসই নীতি নির্ধারণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সহযোগিতা এবং দ্বন্দ্ব নিরসন সম্ভব হয়েছে। এই গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে যে নারীরা এককের চেয়ে সামষ্টিকভাবে চিন্তা করে। নারীদের সেসব সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়, যা জনসাধারণের কল্যাণে সহায়তা করে, ন্যায্য বেতন এবং সুবিধা প্রদান করে এবং সৎ ও নৈতিক আচরণকে উৎসাহিত করে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী যখন নারীরা এগিয়ে যায়, তখন সামগ্রিকভাবে ওই দেশের মানুষ এবং সমাজের জন্য প্রচুর সুবিধা হয়। টেকসই এবং স্থানীয় অর্থনীতি বৃদ্ধি পায়, জনসংখ্যা স্থিতিশীল হয় এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার স্তরের উন্নতি হয়— এগুলো সবই ভবিষ্যতের টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি। গবেষণা দেখায় যে, যেখানে নারীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা বেশি, তাদের দেশে কার্বন নিঃসরণ ১২% কম। অনেক দেশেই নারীরা ভোট গ্রহণের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন এবং সরকারি পদে নির্বাচিত হওয়ার সময় তারা পরিবেশগত ও সামাজিক আইন প্রণয়নেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে। প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও খরায় জীবিকা হারাচ্ছে মানুষ। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে বলে একাধিক গবেষণা সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও সমাধান মেলেনি। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবিতে ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর শেরেবাংলা কৃষি বিদ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT