শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
নতুন কুঁড়ির সেরা ৪০ জনকে স্থায়ীভাবে বিকেএসপিতে ভর্তির আমন্ত্রণপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী খুমেক হাসপাতালের নতুন পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীকে নিজ হাতে লেখা কোরআন উপহার দিলেন ৯ বছরের শিশু কৃষিতে সফল উপকূলের নারীরা ভেরি বাধ ভাঙ্গার আতঙ্ক, এখনো ঘুমাতে পারে না উপকূলের মানুষ ফকিরহাটে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স প্রতিযোগিতার উদ্বোধন সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ যশোরে দুই মাদক ও অস্ত্র মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবনসহ ১৭ বছরের কারাদণ্ড যশোরে দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শরণখোলায় কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

বনদস্যু আতঙ্কে ,সরিয়ে নেওয়া হতে পারে দুবলার শুটকি পল্লী ‌

  • প্রকাশিত সময় : রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১১১ পড়েছেন

বিশেষ প্রতিনিধি : সুন্দরবনের দুবলার চরে প্রতি বছর ৫ মাসজুড়ে চলে শুটকি প্রস্তুতের কাজ। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে তা নানা প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় শুটকি। দুবলার চরের এ শুটকি ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে চলতি মৌসুমে সাগরে বেড়েছে ডাকাতের প্রবণতা, আতঙ্কিত রয়েছেন জেলেরা। এদিকে বন্য প্রাণীদের কথা চিন্তা করে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সংরক্ষিত বন থেকে শুটকি পল্লি সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে বন বিভাগ।
ভোর হতে না হতেই সমুদ্র থেকে মাছ ধরে তীরে ফিরছেন জেলেরা। ছুটছেন শুটকি পল্লির দিকে। সমুদ্র থেকে আনা এই মাছগুলোই পরিণত হবে শুটকিতে।
নভেম্বরের শুরু থেকেই শুরু হয় শুটকি তৈরির মৌসুম। সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় ট্রলার আর শুটকি সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হন মহাজনরা। নির্ধারিত জায়গায় বাঁশ খুঁটির চালা বানিয়ে মাছের অপেক্ষায় থাকেন তারা।
সুন্দরবনের দুবলার চরে শুটকি পল্লিতে দলে দলে শ্রমিক কাজ করেন। কেউ মাছ ধরেন, কেউ বাছাই করেন, কেউ ব্যস্ত শুকানোর কাজে। কাঁচা মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন। ২০১৮ সালের পর বেশ কয়েক বছর জলদস্যুর তৎপরতা না থাকলেও চলতি মৌসুমে সেই আতঙ্কে জেলেরা।
জেলেরা জানান, প্রায় ৪০ জন এক জায়গায় কাজ করে। তারা ডাকাতের আতঙ্কে থাকেন সবসময়।
বঙ্গোপসাগরে জেলেদের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত রয়েছেন বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদস্যরা। সাগরে জলদস্যুদের প্রতিহত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানায় কোস্টগার্ডের কর্মকর্তা।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন অপারেশন অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান বলেন, ‘আমাদের কোস্ট গার্ডদের জেলেদের যে আশঙ্কা বলেছেন এ ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। এরইমধ্যে সুন্দরবনে আমরা বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেছি।’
মূলত আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেল বাড়ীয়া, শেলারচর ও মেহেরআলীর চরে তৈরি হয় লইট্টা, তেলফ্যাসা, ছুরি, রূপচাঁদা ও চাকা চিংড়ির শুটকি। প্রতি কেজি শুটকি মানভেদে বিক্রি হয় ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক যুক্ত থাকেন এ কর্মযজ্ঞে। সুপেয় পানি, সেনিটেশন সমস্যাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে পাঁচ মাস ধরে সমুদ্রতীরের শুটকি তৈরির যজ্ঞে ব্যস্ত থাকেন শ্রমিকরা।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘যদিও এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটি বনের জন্য একটি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। বনে শুটকিকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণে লোকজন এবং জেলে বাস করে।
প্রতি মৌসুমে এখান থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার শুটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হয়। কোনো কেমিকেল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়ায় দুবলার চরের শুটকির চাহিদাও অনেক বেশি।
সুন্দরবন দুবলারচর ট্রান্সপোর্ট সমিতি সদস্য শিব বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের মাছের মান বেশি ভালো। আমরা মাছগুলো উঁচুতে শুকাই যার কারণে বালু লাগে না।’
এদিকে দুলারচরের এই শুটকি পল্লি দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও ক্ষতি করছে সুন্দরবনের। ৫ মাসের সময়ে মানুষের ফেলা বর্জ্য নষ্ট করছে বনের ভারসাম্য। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গড়ে ওঠা বাজার ও মানবচাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবন। তাই দ্রুত পল্লি সংরক্ষিত বন থেকে সরিয়ে না নিলেপাখির চোখে দেখা এই দৃশ্য দুবলার চরের। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের শেষ সীমায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা এই চরে গড়ে উঠেছে শুটকি পল্লী।
ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের পাশাপাশি এই চরের খ্যাতি দেশের সবচেয়ে বড় শুটকির বাজার হিসেবেও। এখান থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শুটকি যায় সারাদেশে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলেরা প্রতি বছর অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ ছয় মাস এখানে ব্যবসার অনুমতি পান। এই চরে কাজ করেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ।
সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের মূলত আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেল বাড়ীয়া, শেলারচর ও মেহেরআলীর চরে হয় মাছ শুকানোর কাজ।
যেসব জেলেদের তিন থেকে পাঁচটি নিজস্ব মাছ ধরার ট্রলার আছে তাদেরকে ডাকা হয় ‘মহাজন’ বলে। যাদের ট্রলারের সংখ্যা আরও বেশি তাদেরকে ডাকা হয় ‘বহরদার’। শুটকির কাজে নিযুক্ত জেলেরা এসব ‘মহাজন’ ও ‘বহরদার’দের হয়ে কাজ করেন।
কয়েকজন ‘বহরদার’ ও ‘মহাজন’র সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—সাধারণত লইট্টা, তেলফ্যাসা, ছুরি, বৈরাগী, চাকা চিংড়ি, রূপচাঁদা শুঁটকি করা হয়। কাঁচা মাছ শুকাতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ দিন। পাইকারদের কাছে গড়ে প্রতি কেজি শুটকি বিক্রি করা হয় ৫০০-৫৫০ টাকায়। এখান থেকেই পাইকাররা শুঁটকি কিনে নিয়ে যান।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়—কয়েক হাজার শ্রমিক শুঁটকি পল্লীতে কাজ করছেন। কেউ রোদে মাছ শুকাচ্ছেন, কেউ আবার ট্রলার নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন মাছ ধরতে।
জেলেরা মাছ নিয়ে এসেই শুরু করেন বাছাইয়ের কাজ। প্রজাতি অনুযায়ী মাছ আলাদা করা হয়। এরপর নানান প্রক্রিয়া শেষে শুকাতে দেন সেসব মাছ।
জেলে মিরাজ শেখ বলেন, ‘সাধারণত তেলা, ফ্যাইসাসহ অন্যান্য ছোট মাছ চাতালে ও লম্বাটে লইট্টা, ছুরি মাছগুলোকে বাঁশের আড়ায় ঝুলিয়ে শুকাতে দেওয়া হয়।’
প্রায় ৩০ বছর ধরে এই চরে মহাজনের কাজ করা ইসমাইল হোসেন এই প্রতিবেদককে ‌‌বলেন, ‘এখান থেকে শুঁটকি নেওয়ার জন্য ১০-১২টি পরিবহন ব্যবস্থা আছে। তারা রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় শুঁটকি পাঠিয়ে দেয়। দেশের শুঁটকির বড় অংশ যায় দুবলার চর থেকে।
তার মতে, সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই চরের শুঁটকি রপ্তানি করে প্রতি বছর হাজার হাজার ডলার আয় করা যেত।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুবলার চর থেকে শুঁটকি পাওয়া গিয়েছিল চার হাজার ১০৫ টন। বন বিভাগের আয় হয়েছিল দুই কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ১০০ টন শুটকি থেকে আয় হয়েছিল ছয় কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২০২৩২৪ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনে হয়েছে এর থেকে আয় হয়েছে ৭ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ২০২৪- ২৫ অর্থবছরে মাছ উৎপাদন হয়েছে ২০হাজার মেট্রিক টন এ থেকে আয় হয়েছে সাত কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ২০২৫-২৬ অথবা বছরে মাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১০০০মেট্রিক টন যা থেকে আয় হবে ৮ কোটি টাকা।
সাগরের যে কোনো ঝড় সবার আগে আঘাত হানে দুবলার চরে। এ কারণে দুবলার চরে কাজ করা অধিকাংশ মানুষের দাবি—সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী।
এই চরে খাবার পানির তীব্র সংকট কাটাতে কয়েকটি পাতকুয়া করা হয়েছে। বর্ষায় সেখানে পানি জমে। ওই পানি জীবাণুমুক্ত নয়। তবুও ওই পানিই ভরসা পল্লীবাসীদের।
আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ছয় মাসের জন্য আসা মানুষগুলোর চিকিৎসা হয় না।
চরের নিউমার্কেট এলাকায় কয়েকটি ওষুধের দোকান আছে। দোকানদাররা অসুস্থতার ধরন শুনে জেলেদের চিকিৎসা দেন।
সেখানে চিকিৎসা সেবা দেওয়া গ্রাম্য : হাবিবুর রহমান/স্টারষষ তারিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই দুর্গম চরে চিকিৎসা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ নাই। অধিকাংশ রোগী আসেন পেটের ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ে। আমরা তাদের চাহিদামত শুধু ওষুধ বিক্রি করি।’
চরের আলোরকোলের পূর্ব দিকে গড়ে উঠেছে বাজার। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ অন্যান্য এলাকার মানুষ দোকান দিয়েছেন ওই বাজারে। এখানে আছে সেলুন, লেদ মেশিন, খাবারের হোটেল, কসমেটিকস, মুদি ও কাপড়ের দোকান। আছে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানও।
জেলেরা এই বাজারের নাম দিয়েছেন ‘নিউমার্কেট’। এসব দোকান থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটান জেলেরা।
বাজারটি দেখে বোঝার উপায় নেই কয়েক মাসের জন্য সেখানে দোকানগুলো বসানো হয়েছে।
চরে মাছ ধরার কাজে আছে শত শত ট্রলার। এসব ট্রলার মেরামতের জন্য আছে কারখানা। নিজস্ব জেনারেটর ব্যবস্থায় কারখানাগুলো চালানো হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে জেনারেটরের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে ওই চরে।
শুকানো মাছ বাছাই করা হচ্ছে বিক্রির জন্য।
দুবলার চরটি দক্ষিণবঙ্গসহ দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবের কারণে। প্রায় দেড় শ বছর ধরে দুবলার চরের আলোরকোলে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে রাস পূজা ও পুণ্যস্নান। পূজা উপলক্ষে এখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আসেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
দুবলার চর ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ এই প্রতিবেদককে‌বলেন, ‘সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে দুবলার চর থেকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পায় সরকার। দেশের মাছের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে চরটি। ওই কাজে যারা সহযোগিতা করেন তাদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই। জেলেদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় সরকারি ব্যবস্থা থাকা দরকার।’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, সংরক্ষিত বনে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের আনাগোনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ পরিবেশের নানা ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। মাছ ধরার অজুহাতে অনেকে হরিণ শিকারসহ নানা অপকর্ম জড়িয়ে পড়েন। সরকারের উচিত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে পল্লীর সার্বিক উন্নয়ন করা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT