সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: গবাদি প্রাণীর জন্য কী অপেক্ষা করছে

  • প্রকাশিত সময় : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৭ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ‘জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানবতার জন্য একটি অস্তিত্ব সংকট’—এই সত্যটা কি আমরা উপলব্ধি করছি? পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে এমন একটি স্তরে পৌঁছেছে, যা পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং গবাদি প্রাণীর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনছে।
জলবায়ু পরিবর্তন গবাদি প্রাণীর জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে, যা খাদ্যনিরাপত্তা এবং কৃষি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং পরিবেশগত পরিবর্তন গবাদিপশুর স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং প্রজননক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য বিরূপ প্রভাব ফেলে। দুগ্ধজাত গবাদি প্রাণীর ওপর জলবায়ুগত প্রভাবের ফলে যেসব সাধারণ লক্ষণ দেখা দিচ্ছে তা হলো—খাদ্য গ্রহণ হ্রাস, দুধ উৎপাদন ও দুধের চর্বি হ্রাস, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বৃদ্ধি, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রজননক্ষমতা হ্রাস।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রাণীদের দেহে হিট স্ট্রেস হয়, যা তাদের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। খাদ্য গ্রহণ কম হওয়ার কারণে প্রাণীরা পর্যাপ্ত শক্তি পায় না, ফলে কাজ করার ক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া গর্ভধারণের হার কমে যায় এবং জন্মানো বাছুরের শরীরের ওজন কম হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে প্রাণীদের দুধ বা মাংসের পুষ্টিমান কমে যায়। শারীরিক স্ট্রেসের কারণে প্রাণীরা কম পরিমাণে দুধ উৎপাদন করে বা মাংসের গুণগত মান কমে যায়। অতিরিক্ত তাপের সরাসরি প্রভাবে ৬৫ শতাংশ দুধ উৎপাদন কমে যায়। এ ছাড়া দুধে প্রোটিনের পরিমাণ কমতে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তন রোগজীবাণু ও প্যারাসাইটের বিস্তার বাড়ায়। উদ্ভূত পরিবেশে নতুন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া প্রাণীদের ওপর আক্রমণ করে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রাণীরা সহজেই সংক্রমণের শিকার হয়। এমনকি কলোস্ট্রামে ইমিউনোগ্লোবুলিনের ঘনত্বও কমে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের পরোক্ষ প্রভাব প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। প্রভাবের ফলে যেসব সাধারণ লক্ষণ দেখা দিচ্ছে তা হলো: (১) মাটির উর্বরতায় পরিবর্তন: বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তন এবং খরার কারণে মাটির আর্দ্রতা হ্রাস পায়। পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি মাটির উর্বরতাকে প্রভাবিত করে, যা প্রাণিখাদ্যের উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। (২) পরিবেশব্যবস্থার রূপান্তর: তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের ফলে চারণভূমি, বনভূমি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পরিবর্তিত হয়। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে প্রাণিপালন ব্যবস্থায় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। (৩) সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি: খাদ্য, পানি, এবং চারণভূমির জন্য মানুষের ও প্রাণীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে। সীমিত সম্পদে জীবিকার জন্য এই প্রতিযোগিতা বিশেষত গ্রামীণ এলাকায় সংকট তৈরি করে। (৪) খাদ্যশস্যের উৎপাদন, গুণগত মান এবং প্রকারে পরিবর্তন: শস্যের বৃদ্ধি ও ফলন জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। খরা বা বন্যার কারণে শস্য উৎপাদন হ্রাস পায়। খাদ্যশস্যের গুণগত মান হ্রাস পাওয়ায় পশুর জন্য উপযুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব হয়। (৫) চারণভূমির উৎপাদনশীলতায় পরিবর্তন: তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনের ফলে চারণভূমি সংকুচিত হয়। ঘাস বা প্রাণিখাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় গবাদিপশুর পুষ্টির ঘাটতি হয়। (৬) রোগতত্ত্বের পরিবর্তনের কারণে নতুন রোগের উদ্ভব: পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে রোগবাহী পোকামাকড়ের বিস্তার বৃদ্ধি পায়। নতুন জীবাণু ও রোগের উদ্ভব হয়, যা প্রাণীদের স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গবাদি প্রাণীর যত্নে যা যা করণীয় তা হলো: (১) তাপ এবং শক্তিশালী সূর্যালোক থেকে প্রাণীদের রক্ষা করা। (২) গবাদি প্রাণীর জন্য ঘন ছায়াযুক্ত গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করা। (৩) খোলা এবং বায়ু চলাচল শেড তৈরি করা, যা প্রাণীদের আর্দ্রতা এবং সরাসরি সূর্যালোক থেকে রক্ষা করে। (৪) শেডের ছাদ পরিষ্কার এবং সাদা রঙের ব্যবস্থা করা (৫) গরমের দিনে প্রাণীদের শরীর ঠান্ডা রাখতে তাদের দিনে ১ থেকে ২ বার ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করানো, বিশেষ করে মহিষকে গোসল করানো এবং ধারায় ঝরনার পানি ছিটিয়ে দেওয়া। (৬) প্রাণীর জন্য সর্বদা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা ও দিনে বারবার পানি পরিবর্তন করা। (৭) পাখা, কুলার, ফোয়ারা ইত্যাদির মতো শেড কুলিং ডিভাইসের ব্যবস্থা করা। (৮) হালকা, সহজপাচ্য এবং তাজা খাবার সরবরাহ করা। সকালে ও সন্ধ্যায় খাবার দেওয়া যখন তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে (গ্রীষ্মকালে ১০টার আগে এবং বিকেল ৪-৫টার পরে খাবার সরবরাহ করা) (৯) শীত না হলে ঠান্ডা আবহাওয়ায় সকালে বা সন্ধ্যায় মাঠে চরাতে হবে। (১০) গরমে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই নিয়মিত ভ্যাকসিন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো এবং যদি প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়ে, দ্রুত প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। (১১) গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং গরমে দুর্গন্ধ রোধের ব্যবস্থা করা। (১২) গবাদি প্রাণীদের জন্য তাপ–সহনশীল (শাহিওয়াল, ব্রাহমা, জেবু জাতের গরু তাপ-সহনশীল গবাদিপশুর জাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়) জাত নির্বাচন করা ।
পরিশেষে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গবাদি প্রাণীদের জীবনে নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। তবে সচেতনতা, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এবং সম্মিলিত উদ্যোগে কাজ করার মনোভাব আমাদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে সরকার, খামারি এবং গবেষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই এবং নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলি, যা মানুষের পাশাপাশি গবাদি প্রাণীদের জীবনও সুরক্ষিত করবে।
ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু ও পাখি পালনে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি ৬ নং ইউনিটের “কৃষি জলবায়ু” ৬.৪ নং পাঠ। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান উত্তর গোলার্ধে। বাংলাদেশের মাঝামাঝি দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা চলে গিয়েছে। তাই এদেশ ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত। বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর—পূর্ব ও দক্ষিণ—পূর্ব দিকে রয়েছে কিছু পাহাড়িয়া অঞ্চল এবং ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়িয়া অঞ্চল। তাছাড়া পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় অবস্থিত বাংলাদেশের উত্তরে। এদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের ভূখন্ড উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে ক্রমশ ঢালু।
এর ফলে নদ—নদীর গতিপথ উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ধরনের ভৌগোলিক অবস্থান জনিত কারণে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, কালবৈশখী, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি প্রভৃতি প্রতিকূল অবস্থা দেখা যায়। জলবায়ুগত কোন কোন উপাদানগুলো ফসল উৎপাদনের জন্য প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি করে। প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টিকারী জলবায়ুগত উপাদানগুলো মধ্যে রয়েছে— ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বোস, বন্যা, খরা ইত্যাদি।
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রোপকূল এলাকায় এর তীব্রতা বেশি। উপকূলের প্রায় ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা প্রায় প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রে যখন নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় তখন তা সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের আকারে স্থলভাগের দিকে আসে।
এর ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উঁচু হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই স্থলভাগে ঢুকে পড়ে। তখন তাকে আমরা জলোচ্ছ্বাস বলি। তীব্রতা ও স্থানভেদে এই জলোচ্ছ্বাসকে কখনও বলা হয় টর্ণেডো কখনও বা হারিকেন বা সাইক্লোন। জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা কেমন তার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন দেশে এবং বিভিন্ন সময়ে এই নাম দেওয়া হয়। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর এলাকার প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন হেক্টর বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশের মাটির লবণাক্ততার প্রধান কারণ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে ভূমি প্লাবিত হওয়া।
জলোচ্ছ্বাসজনিত কারণে লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং পরবতীর্কালের জন্য তা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ—পূর্ব এবং পূর্বমধ্যাঞ্চলের ফসল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক—ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘূণিঝড়ের গতিবেগ ঘন্টায় এমনকি ১৫০ কিলোমিটারেরও বেশি হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রধানত বৈশাখ (মধ্য এপ্রিল) থেকে আরম্ভ করে আশ্বিন—কর্তিক (নভেম্বর) মাসে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয়। বৈশাখ মাসে হলে তাকে প্রাক—খরিফ আর আশ্বিন—কর্তিক মাসে হলে তাকে প্রাকরবি জলোচ্ছ্বাস বলা যায়। এই উভয় সময়েই কমবেশি মাত্রায় তীব্র জোয়ারসহ জলোচ্ছ্বাসে কৃষি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
জলোচ্ছ্বাসের ফলে সাধারণত ৬—১২ ঘন্টা পর্যন্ত সমুদ্র বা নদীর অতিরিক্ত পানি জমির উপরে থাকে। তবে পানি সরে যাওয়ার পরও ক্ষতির প্রভাব থেকে যায় অনেকদিন পর্যন্ত। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রউপকূলবতীর্ ১৩টি জেলার প্রায় একশ থানা অর্থাৎ দেশের প্রায় এলাকা জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরাসরি জলোচ্ছ্বাস ছাড়াও জলোচ্ছ্বাসে সাথের ঘূর্ণিঝড়ে দেশের অভ্যন্তরে আরও সমপরিমাণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোন এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কবলিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়, মানুষ ও গবাদি পশু আহত হয় অথবা মারা যায়। জলোচ্ছ্বাসকবলিত এলাকার পানি দূষিত হয়, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ের ফলে বহু গবাদিপশু ও জীবজন্তু তাৎক্ষণিক মারা যায়, পশু খাদ্যের অভাব্ দেখা যায়, জীবিত গবাদিপশু উদরাময় এবং পেটের পীড়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
ফসল ও অন্যান্য সম্পদ বিনষ্ট হয় বা ভেসে যায়, মাটিতে লোনা ধরে এবং জলাবদ্ধতার ফলে জমির ফসল ও গাছপালা মারা যেতে পারে। কোন এলাকা জলোচ্ছ্বাস কবলিত হলে সেখানকার জন্য তাৎক্ষণিক কাজের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় চাহিদা ভিত্তিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা। এক্ষেত্রে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিল্প, কর্মসংস্থান, উপকরণ সরবরাহ, যোগাযোগ সবগুলির সমন্বয়েই পুনবার্সন পরিকল্পনা তৈরি করা
উচিত। তবে তাৎক্ষণিক উৎপাদনশীল করণীয়ের মধ্যে কৃষির গুরুত্ব সর্বাধিক।
বন্যা সাধারণভাবে নদী—নালা, খাল—বিল দিয়ে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি পানি বয়ে গেলেই বন্যা দেখা দেয়। বন্যা বাংলাদেশে অতি স্বাভাবিক ঘটনা। কোন কোন বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবার কোন কোন বছর বিভিন্ন সময়ে বন্যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়। বৃষ্টি জলীয় বাষ্প সমৃদ্ধ দক্ষিণ—পশ্চিম মৌসুমী বায়ু উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়। এই মৌসুমী বায়ু উত্তরের পাহাড়ের গায়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। বাংলাদেশের উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে ক্রমশ ঢালু হওয়াতে বৃষ্টির পানি নদ—নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় দক্ষিণ দিকে। কিন্তু নদীর পানি ধারণ ও অপসারণ ক্ষমতার তুলনায় পানির পরিমাণ যদি বেশি হয় তবে নদ—নদীর অববাহিকা অঞ্চলসহ দেশের সমতল ভূমির অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
এতে দেশের ন্যূনতম ৫০ ভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে কৃষি উৎপাদন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হয় ৪০—৭০%। আমাদের দেশের বন্যা দেখা দেয় সাধারণত বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাসের মধ্যে যে কোন সময়ে। যে কোন স্থানে বন্যা হওয়ার পর ফসল কৃষি উপকরণ, গবাদি পশু, হাঁস—মুরগী, মৎস্য ও অন্যান্য কৃষি সম্পদ, জমি ও মাটির প্রচুর ক্ষতি হয়। জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, দেশের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায়, রোগব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটে, গো—খাদ্য পাওয়া যায় না, পানি দূষিত হয়, পশুপাখি রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যার সৃষ্টি হয়, গবাদি পশু অপুষ্টিতে ভোগে, বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ও কৃমির আক্রমণ বৃদ্ধি পায়, ঘাসে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়, গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়, অনেক পশুর মৃত্যু হয়।
কোন কোন এলাকায় আগাম বন্যার ফলে সময়মত জমি চাষ ও ফসলের বীজ বপন বা চারা রোপণও ব্যাহত হয়। প্রাপ্ত তথ্য হতে দেখা যায় যে, বন্যায় কেবলমাত্র খাদ্য শস্যের বেলাতেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০—২৫ লক্ষ টন। এর সাথে সাথে নানা ধরনের আর্থ সামাজিক সমস্যাও দেখা দেয়।
খরা বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত ও মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। খরার কারণে এদেশে ৩০—৭০% পর্যন্ত ফসলহানি হতে পারে। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য মাটিতে প্রয়োজনীয় পানির ঘাটতি হলে সেই অবস্থাকে খরা বলা হয়। যে মৌসুমে সাধারণত মাটিতে রসের এই ঘাটতি অবস্থা থাকে তাকে বলা হয় খরা মৌসুম। খরার প্রধান প্রধান কারণগুলি হল অনাবৃষ্টি, সেচের পানির অভাব, প্রখর রৌদ্রতাপ ও বেলে বা ঢালু জমিতে কোন আচ্ছাদন না থাকা। খরা অবস্থায় চারা গাছ খুব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খরাকে তীব্র, মাঝারি ও সাধারণ এই তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে সকল মৌসুমেই খরা দেখা দিতে পারে। বরেন্দ্র অঞ্চল ও গঙ্গা পলিমাটি এলাকার নওয়াবগঞ্জ, রাজশাহী ও নওগাঁ জেলায় প্রায় ১০ লক্ষ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর প্রচন্ড খরা দেখা দেয়। এ ছাড়াও সারাদেশে প্রায় ৫০ লক্ষ হেক্টর জমিতে মাঝারি ধরনের খরা দেখা দেয়। গম, মসুর, সরিষা, গোল আলু, ধান, আখ, ফলমূল, শাক সব্জিসহ প্রায় সকল ধরনের ফসলেই খরায় গড়ে ৩০% ফলন কম হয়। খরা ফসলি জমি, পশু সম্পদ, মাছ ও পরিবেশের উপর বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করে। খরায় পানির অভাবে গাছ মারা যায়। ফসলের বৃদ্ধি কমে যায়, জমি প্রস্তুতিতে অসুবিধা হয়।
বীজ বোনা যায় না ও জমিতে লবণাক্ততা বাড়ে। খরায় চারা গাছ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বয়স্ক গাছে ফুল—ফল ঝরে যায়। খরায় উপসর্গ হিসাবে গাছের পাতা বা কচি ডগা দুপুরে সাময়িকভাবে নুয়ে পড়ে বা সরু হয়ে যায়। পানির অভাবে মানুষ—পশু—পাখি ও মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁচা ঘাসের অভাব হয়, পানি দূষিত হয়, গবাদিপশু ও পাখি অপুষ্টিতে ভোগে, গবাদিপশু ও পাখির বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দেয়, মাঠ ঘাটের ঘাস শুকিয়ে যায়, অধিক তাপে পশুপাখির অসহনীয় অবস্থায় সৃষ্টি করে, তাপ পীড়নে খামারে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির মৃত্যু হয়।
পশু—পাখির খাদ্যের অভাব এবং রোগ বালাইও বেড়ে যায়। ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়।ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, বন্যা খরা ছাড়াও বাংলাদেশের কৃষি শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুযোর্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের কৃষিতে ক্ষতি হয় অপূরণীয়। প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, বাস্তব অবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে শস্য বিন্যাসে প্রয়োজনীয় পুনবিন্যাস, দুযোর্গকালীন ফসল ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ এবং দুযোর্গ পরবতীর্ পুনবার্সন কার্যক্রম গতিশীল ও সু—সমন্বিত করে বাংলাদেশের কৃষিতে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির মোকাবেলা করা যেতে পারে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে পৃথিবীর গোটা জীবজগতের ওপর বেশ ভালোভাবেই পড়েছে, তা একাধিক গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে। উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট অনেক প্রাণীর দেহের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে, রং ও চেহারা বদলে যাচ্ছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার জন্য অনেক উদ্ভিদের শারীরিক গঠনে পরিবর্তন এসেছে।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫২টি প্রজাতির প্রায় ৭০ হাজার পাখির ওপর গবেষণা চালান অস্ট্রেলিয়ার ডেকান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। গবেষণায় তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ক্রমশ আকার বদলাচ্ছে সেই সব পাখির। এর ব্যাখ্যাও তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন ডারউইনের সেই পুরোনো তত্ত্বে। তত্ত্বে উল্লেখ করা হয়েছিল, দেহের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য দেহের মূল কাঠামো ঠিক রেখে যেকোনো প্রাণী তার দেহতল বাড়ায়। বহু বছর আগে করা ডারউইনের তত্ত্বের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে একালের বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও পর্যালোচনা। অনেক পাখি ও প্রাণীর দেহের মূল কাঠামো বা গড়ন ঠিক থাকলেও কিছু কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। উদাহরণ হিসেবে গবেষক দলের গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক সারা রাইডিং বলেছেন, ১৮৭১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই দেড় শ বছরে অস্ট্রেলিয়ান তোতাপাখির চোখের আকার বেড়েছে ৪ থেকে ১০ শতাংশ। এভাবে কোনো কোনো প্রাণীর বেড়েছে নখ ও লেজের দৈর্ঘ্য। এসেছে বিভিন্ন প্রাণীর আচরণেরও পরিবর্তন।
মেরু অঞ্চলের পুরুষ ভালুকেরা বাঁচার জন্য এখন মেয়ে ও শিশু মেরু ভালুকদের খেয়ে ফেলছে। সেখানে বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনে তাদের খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। এই পরিবর্তনকে বিবর্তনের স্বাভাবিক ধারা হিসেবে পরিবেশের সঙ্গে প্রাণীদের মানিয়ে নেওয়ার ঘটনা হিসেবে মানতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু এসব পরিবর্তনের সঙ্গে যখন পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখা যায়, তখন তা আমাদের অবশ্যই দুশ্চিন্তায় ফেলে। কোনো প্রজাতির ব্যাপক পরিবর্তন ও বিলুপ্তি গোটা জীবজগতের খাদ্যশৃঙ্খলের বিশৃঙ্খলাকেই ইঙ্গিত দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তির শঙ্কা। আমরা কি তাহলে বিশ্ব জীববৈচিত্র্যের ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির দিকেই যাচ্ছি? তেজষ্ক্রিয়মিতি অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স আনুমানিক ৪৫৭ কোটি বছর। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক ও জীবাশ্মবিদ্যাগত ঘটনা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, পৃথিবীতে এর আগে পাঁচবার গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন যুগের সীমা নির্ধারিত হয়েছে এ ধরনের গণবিলুপ্তির ঘটনায়। উদাহরণস্বরূপ, ক্রিটেশিয়াস যুগ ও প্যালিওজিন যুগের সীমা নির্ধারণ করেছে একটি বিলুপ্তির ঘটনা, যার নাম ক্রিটেশিয়াস-টার্শিয়ারি বিলুপ্তির ঘটনা। এই বিলুপ্তির মাধ্যমে পৃথিবীর বুক থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়।

গত ৮ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে বিশ্বখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ ও মেরুদণ্ডী প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, যা এর আগে জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এই পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, তার মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ হলো অমেরুদণ্ডী প্রাণী, যাদের ৯০ শতাংশ পতঙ্গ বা পোকামাকড়। এসব পোকামাকড় আমাদের খাদ্য উৎপাদনের জন্য পরাগায়ণ ঘটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এরা জৈব আবর্জনা পচিয়ে মাটিকে উর্বর করছে।
সত্যি যদি পোকামাকড় এই পৃথিবীতে না থাকে বা কমে যায়, তাহলে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনে বর্তমানে ২৪ শতাংশ অমেরুদণ্ডী প্রাণী, ১৮ শতাংশ মেরুদণ্ডী প্রাণী এবং ২৭ শতাংশ উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমরা শুধু পৃথিবীর ওপরের জীববৈচিত্র্য নিয়েই ভাবছি। অথচ মাটির মধ্যেই রয়েছে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জীবগোষ্ঠী। গবেষকেরা বলেন, এখন যে হারে যত দ্রুত বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের বিলোপ ঘটছে, এর আগে মানবসভ্যতার ইতিহাসে আর কখনো সেরূপ দেখা যায়নি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে তিন ভাগের এক ভাগ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি।

ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান অবস্থা বোঝাতে গত ২১ এপ্রিল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় প্রকাশিত হয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ‘দ্য স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট ২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃতি তার রূপ পরিবর্তনের ধরন পাল্টেছে। এতে বদলে যাচ্ছে ঋতুবৈচিত্র্য। গাছে ফুল ফুটছে হয় আগে, না হয় পরে। জাপানে গত ৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতিবছর চেরি ফুল ফোটার তারিখ রেকর্ড করা হচ্ছে। রেকর্ড থেকে দেখা যায়, ২০২১ সালেও চেরি ফুল ফুটেছিল ২৬ মার্চ, ২০২২ সালে ফুটেছে ১ এপ্রিল। ষড়্‌ঋতুর বাংলাদেশ হয়ে গেছে ২ বা ৩ ঋতুর। এভাবে ঋতু বদলের বিপাকে ভবিষ্যতে কদম ফুল কখন ফুটবে, তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যে কদম ফুল বর্ষায় ফুটত, এখন তা বছরের বিভিন্ন সময়ে ফুটছে। হেমন্তেও এখন কদম ফুল ফুটছে। জাত বা ঋতুচক্রের বিপাকে পড়ে হোক, বিজ্ঞানীদের কৃতিত্বেই হোক, এখন অসময়েও আমগাছে মুকুল আসছে। তবে উদ্ভিদজগতে জলবায়ুর প্রভাব কিন্তু সুস্পষ্ট।

সম্প্রতি এক সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তুতন্ত্রকে ব্যাহত করে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এবং বায়ু, পানি ও মাটির গুণমান প্রভাবিত করে দূষণের মাত্রা আরও খারাপ করে। এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্য ও সমস্ত জীবের স্বাস্থ্যের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।’ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন অনেক রোগ-জীবাণু আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে কোনো কোনো জীবাণু। বিগত কুড়ি বছরে ডেঙ্গু রোগ বিস্তৃত হয়েছে ১২৯টি দেশে, যা কুড়ি বছর আগে সীমাবদ্ধ ছিল মাত্র ৯টি দেশে। খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে আগের চেয়ে এখন প্রতিটি পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কতটা বেড়ে গেছে, স্বাস্থ্যগত দুর্বলতার কারণে আমাদের কতটা কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

পরিবেশসংশ্লিষ্ট সবাই এখন উপলব্ধি করছেন, আমাদের তথা মানব জাতি ও পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ মূলে কাজ করতে হবে। কথার চেয়ে এখন কাজই বেশি দরকার। কোন দেশে কে কী করেছে, তা জানার চেয়ে নিজেরা কী করছি তা খতিয়ে দেখা দরকার। আমরা কি ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের দেশ থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস কত শতাংশ কমাব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রোডম্যাপ আছে? নিলে তার কৌশলগুলো কী, তা কি আমরা সবাই জানি? সেই লক্ষ্যে কতটুকু কাজ হয়েছে, অগ্রগতি কী—এসব পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। তবে এর জন্য গণসচেতনতা সৃষ্টি দরকার সবার আগে।
প্রথমে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে পারিবারিকভাবে পরিবেশ শিক্ষায় শিশুদের শিক্ষিত বা আগ্রহী করতে, যেন প্রথম থেকেই তারা নিজেদের পরিবেশের প্রতি যত্নবান হয়। প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মী, সংগঠন, গ্রুপ ও তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে সঠিক কৌশলপত্র প্রণয়ন করে জীবজগতের প্রতিটি জীবের প্রতি দয়াবান হওয়ার দীক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে। শিক্ষালয়ের পাঠ্যবইয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে কতটুকু আছে, সেটাও দেখতে হবে, পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যোগ করতে হবে। অন্তর থেকে পরিবেশ ও জীবের প্রতি মমতা সৃষ্টি না হলে হাজার পাতা লিখে ও বক্তৃতা দিয়ে কোনো লাভ হবে না।বর্তমানে সারা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ বিপর্যয়ের মুখে। বায়ু মন্ডলে পূঞ্জিভূত গ্রিনহাউস গ্যাস উৎসারণের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও কৃষি কাজে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ভূমিকা নেই বললেই চলে। তবে বিশ্বে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম।
৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। ১৯৭২ সালের জুন মাসে সুইডেনের স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশের ওপর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের ২৭ তম অধিবেশনের প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ঐ সম্মেলনের পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ দিবস উদযাপিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারনে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভুমি বাংলাদেশ। সবুজ বন, নদী, নালা ও জলপ্রপাত এদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আরো মনোরম করেছে। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষও বিভিন্ন ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির উৎস হুমকির মুখে পড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ন স্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নানা কারনে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলি আক্রান্ত হয়েছে জনজীবনে নেমে এসেছে নানা বিপর্যয়। বিশ্বে মানুষের যত রকম ঝুকি রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা তার মধ্যে অন্যতম। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য মুলত কার্বন ডাই অক্সাইড কে দায়ী করা হয়। কিন্তু এর সাথে মিথেন, নাইট্রস অক্সাইড, ক্লোরো ফ্লরো ইত্যাদি গ্যাস বিশেষ ভুমিকা রাখে। গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ হচ্ছে। মানব সভ্যতার অগ্রগতি, প্রযুক্তি ও শিল্প উন্নয়নে নির্মানকারী কারখানা, শিল্প কারখানা থেকে বায়ু মন্ডলে সিএফসি গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। মানুষের অসচেতন কর্মকান্ডের ফলে বায়ু মন্ডলে এসব গ্যাস যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতায় ভুমিকা রাখছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সময় এবং অবস্থানে পরিবর্তিত হয়। এখন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ার কারণে আর্কটিক অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়েছে ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT