শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা আবহমান বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য : নিতাই রায় চৌধুরী ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের ফোনে আড়িপাতার অভিযোগ, গ্রেপ্তার চিফ অব স্টাফ বুকে তীব্র ব্যথা, হাসপাতালে ভর্তি শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক দেশের সব কারাগারের জন্য ৭ দফা নির্দেশনা জারি মোংলা বন্দর হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র: নৌপরিবহনমন্ত্রী জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস শনিবার, সরকারি ছুটি পাবেন না যারা ​শার্শায় দেশীয় তৈরি ওয়ান শুটার পিস্তল উদ্ধার ​ জলবায়ু ঝুঁকিতে ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ, তিন-চতুর্থাংশ বাংলাদেশে ভারতের পাঞ্জাবে চলন্ত ট্রেনে ভয়াবহ আগুন শিক্ষানবিশ চালকদের জন্য নতুন নির্দেশনা বিআরটিএর

উপকূলবাসীর দাবি ‌ত্রাণ নয়; স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ চাই

  • প্রকাশিত সময় : রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১৮৯ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ‌ : দুর্যোগ দুর্বিপাকে ভরা বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের আগে থেকেই বারবার এই ভূখণ্ডে প্রকৃতি নানারূপে, নানা ধরনে আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসের আঘাতটা বেশ ভয়ঙ্কর। যেমন ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা যায়। এভাবে বারবার ঘূর্ণিঝড় আসে উপকূলে প্রকৃতির নিয়মে।
ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আসা জলোচ্ছ্বাস, তা দুর্বল বা শক্তিশালী যাই হোক না কেন, প্রথমেই আঘাত করে বেড়িবাঁধকে। বেড়িবাঁধ নতুন অবস্থায় মজবুত ছিল, তাই জোয়ারের ধাক্কা সামলাতে পেরেছে।
কিন্তু প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাঁধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে, পানির ধাক্কায় অনেক জায়গা ভেঙে যায় বা ক্ষয়ে যায়। লোনা পানি গ্রাম, লোকালয়, জনপদ প্লাবিত করে, ফসলের ক্ষতি করে।
জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলবাসীকে রক্ষার জন্য তৈরি করা হয় বেড়িবাঁধ। বাংলাদেশের উপকূলে বেড়িবাঁধ তৈরির কাজ শুরু হয় ষাটের দশকে।
ষাট বছর আগের এ বাঁধের অবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখন জরাজীর্ণ, বিশেষ করে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে। ভাঙাচোরা বাঁধ যে প্রবল জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে অক্ষম তা বারবার প্রমাণিত।
বাংলাদেশের বেড়িবাঁধগুলো ষাট-সত্তরের দশকে নির্মিত। সেসময়ে বড় দুইটি ঘূর্ণিঝড়ের পর জনজীবনের নিরাপত্তা ও কৃষি সুরক্ষার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে নির্মিত হয়েছিল এসব বেড়িবাঁধ। দৈর্ঘ্যে এই বাঁধ ৫ হাজার ৭৫৭ কিলোমিটার।
যার বড় অংশ আজ দুর্বল ও ভঙ্গুর প্রায়। কার্যত এই দীর্ঘসময়ে ওই সব বেড়িবাঁধের কোনো উন্নয়ন হয়নি, তবে কখনো কখনো প্রচুর অর্থ অপচয় হয়েছে। অন্যদিকে নদীতে জমেছে প্রচুর পলি। বাঁধ ক্ষয়ে গেছে, বেড়েছে পানির উচ্চতাও। এর মধ্যে আগের তুলনায় অল্প সময়ের ব্যবধানে আঘাত হানছে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়। ফলে ওই পুরোনো বাঁধ দিয়ে এখন অতিরিক্ত ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আটকানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিগত ত্রিশ বছরে বাংলাদেশে ২৩৪টি ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত দুই লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ সময়ে পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতি বছর পাঁচ শতাংশ লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা ক্রমাগত দেশের মধ্যাঞ্চলের দিকে প্রবেশ করছে। ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ২৪০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে লবণাক্ততা। অন্যদিকে প্রত্যক্ষ হিসেবেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বর্ণনাতীত। শুধু সিডরেই ক্ষতি হয়েছে জিডিপি’র অন্তত ৩% যা আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র এক সমীক্ষায় বলছে, ২০৭০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্য আরেকটি গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের ১৭ শতাংশ ভূমি হারিয়ে যাবে এবং এই সময়ে আমরা ৩০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতা হারাবো। ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং শুধু এই একটি কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে প্রায় ২ শতাংশ। আরও দুঃখজনক খবর হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৪৭ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছে।
টেলিভিশনের নিউজ বুলেটিনে এবং সংবাদপত্রের পাতায় আমরা দেখেছি জোয়ারের পানি যখন বাড়তে শুরু করে; তখন সেখানকার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শতশত মানুষ লড়াই করছেন বাঁধ বাঁচানোর জন্য। আমরা দেখেছি মানুষ জীবন-জীবিকা-বাসস্থান বাঁচানোর জন্য মাথায় করে মাটির বস্তা, বালির বস্তা নিয়ে বাঁধের ওপর ফেলছেন বাঁধ রক্ষা করতে। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে আনছেন বাঁধের জন্য। বাঁশের খুঁটি, গাছের ডাল বসিয়ে দিচ্ছেন বাঁধের পাশে, যাতে বাঁধ ভেসে না যায়। এ হলো বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
উপকূল এলাকার মানুষ যখন বাঁধ রক্ষার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছিলেন, সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের কেউ সেখানে এসেছিলেন কিনা জানি না। সংবাদপত্র বা টিভির রিপোর্টে তার উল্লেখ নেই।
ইয়াসের কিছু ছবি আমাদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। অসংখ্য স্থানে বুক দিয়ে বাঁধ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে সাধারণ মানুষ। পিঠ দিয়ে উত্তাল ঢেউ থামানোর চেষ্টা করেছে তারা। এসব প্রচেষ্টা কোথাও কোথাও সফল হয়েছে, কোথাও হয়েছে ব্যর্থ। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামত করা এসব বাঁধ দিয়ে এভাবে আর কত দিন? এই ভাঙা-গড়ার খেলা আর কত দিন দেখতে হবে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে? টেকসই বেড়িবাঁধ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার প্রচণ্ড অভাব কিংবা অনীহা আজ তাদের এই অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পেরেছে মহাবিপদ আসন্ন, তখনই তারা কোদাল হাতে, মাটির ঝুড়ি মাথায় নিয়ে বাঁধ রক্ষায় নেমেছে। হয়তো সফল হয়েছে, অথবা হয়নি, প্রাণপণ চেষ্টা তো করেছে। পাউবোর প্রকৌশলী বা কর্মকর্তারা তখন কেন এগিয়ে আসেননি? তারা কি ডেল্টা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছেন?
উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামত করা হোক। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়েছে, সে কারণে বাঁধ মজবুত করার সঙ্গে সঙ্গে বাঁধের উচ্চতাও বাড়াতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে, যাতে জোয়ার যত বেশিই হোক, বাঁধ উপচিয়ে যেন পানি আসতে না পারে। কিন্তু উপকূলবাসীর আবেদন, নিবেদন, দাবি কর্তৃপক্ষের কানে কতটা প্রবেশ করে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
জরাজীর্ণ বাঁধ মেরামত বা পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থের বরাদ্দ কত আছে আমার জানা নেই। তবে ধারণা করতে পারি, এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বরাদ্দ নিশ্চয়ই কম নয়। তা কি সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে প্রশ্ন জনগণের মনে রয়েছে। সঠিকভাবে ব্যয় হলে বাঁধের এত দুরবস্থা হবে কেন?
খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের মোট ১৬ হাজার ২৬১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর, নাজুক।
যদি নদীগুলোর পলি সরানো যেতো। ঠিক মতো ড্রেজিং করা হতো তাহলে সংকট ‌অনেকটাই কাটতো। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে খুলনা অঞ্চলে। ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডারে কাজগুলো পেয়েছে চাইনিজ কোম্পানি। ম্যাক্সিমাম প্রোফিট মার্জিন রেখে এই চাইনিজ কোম্পানিগুলো কাজ দিয়েছে দেশীয় ঠিকাদারদের। তারা আবার সাব কন্ট্রাক্ট দিয়েছে স্থানীয় ঠিকাদারদের। এভাবে ৩ হাত ঘুরে যখন কাজটা হচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই কাজটা হয়েছে দায়সারা গোছের। কোথাও কোথাও স্থানীয়রা প্রতিবাদ করেছে। সেই জায়গাগুলোতে কিছুটা ভালো কাজ হয়েছে। চাইনিজ কোম্পানিকে যদি বাধ্য করা যেতো- যাতে তারা কাজগুলো নিজেরা করে এবং সঠিক নজরদারি করা যেতো তাহলে এই দুরঅবস্থা হতো না।
বাঁধগুলোর নাজুক অবস্থার পেছনে আরও দুইটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি-
১. বিভিন্ন জায়গায় মাছের ঘের করার জন্য লবণাক্ত পানি ঢুকানোর জন্য পাইপ বসানোর কারণে বাঁধ কাটা হয়েছে। ফলে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
২. বাঁধের উপরে ইঁদুর বাসা বেঁধে ছোট ছোট গর্ত করে। এই ছোট ছোট গর্ত দিয়ে পানি ঢুকে পরে বড় ক্ষতি করে।
ভবিষ্যতে টেকসই বাঁধ নির্মাণে এই বিষয়গুলোও মাথায় রাখতে হবে।
জন্ম থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে আজ ক্লান্ত। তারা এখন আর ত্রাণ চায় না, চায় পরিত্রাণ, চায় স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ। তারা আর বুক দিয়ে বাঁধ বাঁচাতে চায় না, চায় সরকার তাদের বেড়িবাঁধ বেঁধে দিক। বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করুক। ঘূর্ণিঝড় আরও আসবে, আসতেই থাকবে। তাদের ঘাম, চোখের পানি এবং ভিটেমাটি হারানোর কষ্ট নাড়া দিক শহুরে বাবুদের মনে। এবার একটা স্থায়ী সমাধান হোক।
২০২৪ সালের২৬ মে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রিমাল। প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশের উপকূলে ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার ঘটনা ঘটে। রিমালের স্থায়িত্বের দিক থেকে অন্যান্য ঘূর্ণিঝড় থেকে বেশ আলাদা। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের ঘূর্ণিঝড় রিমাল বেশি সময় ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে বাংলাদেশের উপকূলে। রিমাল তাণ্ডব চালিয়ে চলে যাওয়ার পরও এখনো রয়ে গেছে এর ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত।
রিমালের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূল অঞ্চলের বেড়িবাঁধ। খুলনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, সাতক্ষীরাসহ দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনায় বাঁধ ভাঙে বেশি। খুলনা বিভাগে ৬১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বরগুনায় ১২ কিলোমিটার, পটুয়াখালীতে ৯ কিলোমিটার এবং ভোলায় ১৩ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ৫০ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি হয়। এর আগেও সিডর, আইলা, আম্ফানসহ অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বেড়িবাঁধ ভেঙে যেতে দেখা গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাবে—এটিই হয়ে উঠেছে উপকূলের স্বাভাবিক ঘটনা। তবে টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরি করা গেলে হয়তো কিছুদিন পরপর উপকূলের মানুষদের এমন পানিবন্দি হয়ে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হতো না।
খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট উপকূলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চিংড়িচাষ। ওই জেলাগুলোর উপকূলীয় অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। যখন লোকালয়ে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করে তখন এসব অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলো পানিতে ভেসে যায়। ফলে বেশ মোটা অঙ্কের লোকসানে পড়তে হয় চিংড়ি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্তদের। এ অঞ্চলের অর্থনীতি বেশ বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পূর্বেই দরজায় কড়া নাড়তে থাকে নতুন কোনো ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এসব ঘের ব্যবসায়ীর জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না, যার ফলে এই ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হন এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
এ ছাড়া লোকালয়ে পানি ঢুকে ভেসে যায় মানুষের ঘরবাড়ি। ফলে মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়ে গৃহহীন। যদিও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঘূর্ণিঝড় কবলিতদের সাহায্য করা হয়, তবু এই সাহায্য যথেষ্ট নয়। এই সাহায্য প্রদান প্রক্রিয়ায় রয়েছে স্বচ্ছতার অভাব। অনেক সময় দেখা যায়, এই সাহায্য কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায়ই না।
উপকূলের মানুষের মধ্যে বেড়িবাঁধ ভাঙা বিষয়ে একটি কথা চালু আছে। জানি না সেটা কতটুকু সত্য। তারা বিশ্বাস করেন, এ অঞ্চলের চিংড়ি চাষিরা নিজেদের ঘেরে লোনা পানি তোলার জন্য বেড়িবাঁধে ছিদ্র করে দেন। আর এ ছিদ্রগুলো ধীরে ধীরে বৃদ্ধি বাঁধগুলো ভাঙায় কাজ করে। তবে বাঁধের ভঙ্গুরতায় শুধু চিংড়ি চাষিদের দোষারোপ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিও দায়ী। কর্তৃপক্ষের উচিত যে কোনো মূল্যে এসব বাঁধ রক্ষা করা। এ ক্ষেত্রে তাদের উচিত চিংড়ি চাষিদের সচেতন করা এবং চিংড়ি চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পানির বিকল্প ব্যবস্থা করা।
বেড়িবাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতিরও অভিযোগ রয়েছে। সবসময়ই দেখা যায় ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার পরপরই পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ সংস্কারের জন্য তোড়জোড় শুরু করে। অথচ সারাবছরই উপকূলের একটি বড় অংশ বাঁধ না থাকার কারণে অরক্ষিত থাকে। এভাবে সংস্কার করা বাঁধ টেকসই হয় না। যে কোনো সময় পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বাঁধগুলো ভেঙে প্লাবিত হয়।
প্রতিবছর সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ বরাদ্দ করা হয় দেশের উপকূল রক্ষার জন্য। অথচ দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগই লোপাট হয়ে যায়—এমন অভিযোগ গণমাধ্যমে হরহামেশায় প্রকাশিত হয়। ফলে উপকূলবাসী পায় না তাদের বহুল কাঙ্ক্ষিত বেড়িবাঁধ। তারপর নতুন একটি ঘূর্ণিঝড় আসে, আবার প্লাবিত হয় উপকূল। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর।
বেড়িবাঁধ তৈরির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ হওয়ার বিষয়ে উপকুলের জনগণ থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সকলেই কমবেশি অবগত থাকা স্বত্বেও কেন এটি বন্ধ হচ্ছে না, তা আমাদের অজানা। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপদস্থদের আন্তরিকতা কামনা করছি।
ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরির আশ্বাস দেওয়া হলেও কিছুদিন পরই কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভুলে যায় সে আশ্বাসের কথা। অথচ টেকসই বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীর প্রাণের দাবি। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য উপকূলের মানুষকে ত্রাণ বা সাহায্য প্রদান করা হয়ে থাকে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে খুবই সামান্য। এ ছাড়া এ নিয়ে এ অঞ্চলের মানুষের মনে রয়েছে অসন্তোষ। ফলে মানুষ ত্রাণ চায় না, তারা চায় টেকসই বেড়িবাঁধ। টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরি করা হলে তারা অন্তত ঘূর্ণিঝড়ে পানিবন্দি হওয়ার ভয় থেকে মুক্তি পাবে। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও অনেক কমে আসবে। হারাতে হবে না নিজেদের মাথা গোঁজার শেষ সম্বল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT