শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
খেলাধুলার মধ্য দিয়ে যুবসমাজকে অপরাধ থেকে দুরে রাখতে পারে : বাগেরহাট জেলা প্রশাসক বাগেরহাটে মূলহোতাসহ ৪ ডাকাত গ্রেফতার: টাকা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার মরিশাসে কন্টেইনার দুর্ঘটনায় ৩ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে হতদরিদ্র, দুস্থ ও পথশিশুদের মাঝে খাদ্য বিতরণ ইসলামের নামে রাজনীতি করছে, অথচ ইশতেহারে ইসলাম নেই: স্বরাষ্ট্ৰমন্ত্রী জাতীয় চার নেতা ও জয় বাংলার নামে থাকা কোস্টগার্ডের ৫ জাহাজের নাম বদল পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে বাসে তুলে ক্যাম্পাসে নিয়ে গেলেন কুবি শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে খাল পরিষ্কারের কাজ করলেন উজিরপুরের ইউএনও নড়াইলে নারী নৌকা বাইচ, সাংস্কৃতিক উৎসব  ও ফ্রি হেলথ ক্যাম্প  উদ্বোধন সাতক্ষীরায় খাবারে চেতনানাশক মিশিয়ে ৪৪ লাখ টাকার মালামাল লুট

সাতক্ষীরা প্রাণসায়ের খাল: স্বপ্ন আর প্রতিশ্রুতির বন্ধন

  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮৫ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা প্রাণসায়ের খাল। এখন যার প্রাণ নেই, কিন্তু আছে অনেক স্বপ্ন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর লোক দেখানো কর্মকান্ড। অনেকে এটিকে প্যারিসের খাল ভাবে, আবার অনেকে এটিকে বর্জ্য ফেলার জায়গা বা দুর্নীতি করার মাধ্যমও ভাবে। আর তাই প্রাণসায়ের খালের প্রাণ না থাকলেও তাকে নিয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, মিথ্যা পরিকল্পনা, রাজনীতি বা অপরাজনীতি বছরের পর বছর চলতেই থাকে।
সাতক্ষীরা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাণসায়ের খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি শহরের ইতিহাস ও জীবনধারার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এক সময় এই খাল সাতক্ষীরা শহরের মানুষের যাতায়াত, বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্র ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬৫ সালে সাতক্ষীরার জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরী শহরের পানি নিষ্কাশন ও নৌযান চলাচলের জন্য এল্লারচর এলাকা থেকে এই খাল খনন করান। খালটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৩ কিলোমিটার ও প্রস্থ ২০০ ফুট। পরবর্তীতে তাঁর নামেই এই খালের নামকরণ করা হয় “প্রাণসায়ের খাল”।
একসময় বড় বড় নৌকা, লঞ্চ, ষ্টীমার এই খালে চলতো। শহরের বড় বাজারে পণ্য আসা, মানুষ সহজে অন্যত্র যাতায়াত করা, এবং বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের প্রধান মাধ্যম ছিল এই খাল। এই খাল শহরের অর্থনীতি ও যোগাযোগের প্রাণ হয়ে উঠেছিল সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। ১৯৯০ সালে এই খালের দুই প্রান্তে দুটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এর ফলে খালের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে খালটি নোংরা ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। দখল ও দূষণও বাড়তে থাকে। খালের দুই পাশে গড়ে ওঠে অবৈধ স্থাপনা, খালে ফেলা হতে থাকে ময়লা-আবর্জনা। খালের অংশ দখল করে ঘের করা, পানি প্রবাহে বাধা প্রদান সহ নানা কারণে প্রাণসায়েরের জীবন ও ব্যাপ্তি হ্রাস পেতে থাকে।
বর্তমানে খালটি না মরে কোনও রকম বেঁচে আছে। ২০০ ফুট প্রশস্তের খাল এখন মাত্র কয়েক ফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। শহরের ময়লা-আবর্জনা আর বড় বাজারের বর্জ্যের প্রধান বাহক এখন এই খাল। ২০২০ সালে প্রশাসন খালটি উদ্ধারের জন্য খাল ধারের ২২৯টি অবৈধ স্থাপনা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সামগ্রিক অসহযোগিতার কারণে সেটি ব্যর্থ হয়।
খাল পুনরুদ্ধারের জন্য ২০১৯-২১ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রায় ১৩ কিলোমিটার খাল খননের কাজও হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও খাল ভরাট ও দূষিত হতে থাকে। কারণ খালটি নতুন ভাবে কাটার সময় পর্যাপ্ত গভীর করা হয়নি এবং প্রশস্ততা কমিয়ে এটিকে একটি বড় ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে খালটিতে জোয়ার ভাটা হলেও এটির নাব্যতা আবার হুমকির মুখে পড়েছে এবং ময়লা আবর্জনায় এটি আবার ধ্বংস হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
খালটি নোংরা ও ধ্বংস হওয়ার পিছনে সাতক্ষীরার সাধারণ জনগণ, প্রশাসন, ও পৌরসভা সমান ভাবে দায়ী। সাতক্ষীরা শহরের মানুষ খালটির বিষয়ে খুবই অসচেতন। খালের ধারে এবং খালের পানিতে মানুষ যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে থাকে। অনেকে নিজ বাড়ির ড্রেনের সংযোগ সরাসরি দিয়ে রেখেছে খালের সাথে, ফলে প্রতিনিয়ত খালের পানি দুষিত হচ্ছে। অনেকে দূর দূরান্ত থেকে এসে মরা কুকুর, বিড়াল, মুরগি ইত্যাদি এই খালের পানিতে ফেলে যায়। এছাড়া, কাটিয়া টাউন বাজার ও সুলতানপুরে বড় বাজারের পাশে হওয়ায় মানুষ ইচ্ছামতো বর্জ্য এই খালে ফেলে। বিশেষ করে বড় বাজারের মাছ ও মাংসের উচ্ছিষ্ট, মুরগির পাখনা, পচা ও পরিত্যক্ত শাক-সবজি ও ফল ফলাদির শেষ আশ্রয়স্থল এই খাল। এছাড়া বড় বাজারে রয়েছে অনেক মিল, কারখানা ও গুদাম ঘর। এই সব মিল, কারখানা ও গুদাম ঘরের বর্জ্য নিয়মিত ফেলা হয় এই খালে।
প্রাণসায়ের খাল ধ্বংসের পিছনে সাতক্ষীরা প্রশাসনের রয়েছে দায়। দুনিয়ার ময়লা আবর্জনা খালের পানিতে মিশলেও প্রশাসন এ বিষয়ে নির্বিকার। খালের বিষয়ে তাদের নেই নিজস্ব কোনও তদারকি। যারা ময়লা আবর্জনা ফেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ভাবে কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বড় বাজারের মিল কারখানা বা বাজার থেকে যে ময়লা আবর্জনা ফেলা হয় সে বিষয়ে প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নেয় না।
প্রাণসায়ের খাল ধ্বংসের পিছনে সবচেয়ে বড় দায় রয়েছে সাতক্ষীরা শহরের অভিভাবক সাতক্ষীরা পৌরসভার। অভিভাবক নিজে থেকেই খালটি ধ্বংসের জন্য অগ্রগামী। ইটাগাছা থেকে শুরু করে নারিকেলতলা পর্যন্ত খালের ধারে নাম মাত্র মূল্যে কয়েক শত দোকানের ইজারা দিয়ে রেখেছে সাতক্ষীরা পৌরসভা। পৌরসভা খালের অবৈধ স্থানে দোকান বসিয়ে খালের গলা চেপে ধরে রেখেছে কয়েক যুগ ধরে। যার কারণে খাল ২০০ ফুট থেকে কমতে কমতে আজ তার প্রশস্ততা কয়েক ফুটে এসে দাঁড়িয়েছে।
পৌরসভার নিজস্ব কয়েকটি বড় বড় ড্রেনের মুখ এই খালের সাথে সংযোগ করা হয়েছে, ফলে শহরের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা নোংরা ড্রেন দিয়ে সরাসরি খালের পানির সাথে মিশে। খালটি যেনো সুস্থ থাকে পৌরসভা সেটি না ভেবে খালটিকে কি করে অসুস্থ করা যায় পৌরসভা সর্বদা সেই পথ খোজে। পৌরসভার পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে প্রচেষ্টা নেয়া হয় খালের ধারে ডাস্টবিন নির্মাণের। ডাস্টবিন নির্মাণ করলে শহরের সকল ময়লা সেই ডাস্টবিনে ফেলার পরে সেটি খুব সহজে খালের পানির সাথে মিশে যায়।
আবর্জনার নোংরা, পচা, ময়লা ও উৎকট দুর্গন্ধে তখন খালের পাশেই যাওয়া যায় না। এছাড়া বড় বাজারের মাছ-মাংসের দোকান ও কসাই খানার ময়লা আবর্জনা খালের পানিতে অবিরত প্রবাহিত হলেও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে কোনও মাথা ব্যথা নেই। কয়েক মাস পূর্বে পৌরসভা খালের ধারে আবারও কয়েকটি ডাস্টবিন নির্মাণের চেষ্টা করলে শহরের সচেতন নাগরিক ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির প্রচেষ্টায় সেটি আটকানো গেছে। এরপর পৌরসভা আবার চেষ্টা চালাচ্ছে বড় বাজারে খালের ধারে নতুন কসাইখানা নির্মাণের, যাতে কসাইখানার যাবতীয় ময়লা খালের পানির সাথে মিশে। এই অপরাধ মূলক কাজ বন্ধ করার জন্যও সাতক্ষীরার সচেতন নাগরিকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা পৌরসভা প্রাণসায়ের খালের রক্ষকের দায়িত্বে থেকে সর্বদা ভক্ষকের ভূমিকায় দেখা যায়।
প্রাণসায়ের খালের উন্নতির বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার নিকট থেকে সর্বদা অনেক প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কখনও বাস্তবায়ন দেখা যায় না। প্রতি মাসে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভা হয় এবং প্রায় সভায় প্রাণসায়ের খাল নিয়ে কিছু না কিছু বলা হয়, অপর দিকে সাতক্ষীরা পৌরসভার কর্তা ব্যক্তিরা প্রায় প্রাণসায়েরকে প্যারিসের খালে রূপান্তরের বাসনার কথা জানান, কিন্তু দিন শেষে সবার কথা আসলে মুখেই থেকে যায়, কারণ তাদের কথা গুলো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কিছুই না।
২০২০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রাণসায়ের খালকে আধুনিকায়ন করার এক প্রকল্পের কথা শোনান। তিনি বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেন প্রাণসায়ের খালের এক প্রস্তাবিত নকশা। যেখানে খালের পানি স্বচ্ছ নীল, খালের ধারে নেই কোনও অবৈধ স্থাপনা, সেখানে নেই কোনও ময়লা আবর্জনা, খাল ধার বেয়ে বয়ে চলেছে আধুনিক ওয়াক ওয়ে এবং সুন্দর বসার স্থান আর রাতের ঝলমলে রঙ্গিন আলো। এই নকশা প্রকাশ পাওয়ার পর সাতক্ষীরাবাসী এক নতুন প্রাণসায়ের খালের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা, প্রকল্প ও নকশা শুধু ছবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল, সেটি আর বাস্তবে দেখা যায়নি।
তারপর প্রাণসায়ের খাল নতুন ভাবে খনন করা হয়। প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটার খাল খনন করা হলেও সেটি পর্যাপ্ত গভীর করা হয়নি এবং খালের প্রশস্ততা কমিয়ে বড় ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। তবে ইতিবাচক কথা এটি যে প্রাণসায়ের খালে অনেক কাল যাবত জোয়ার ভাটা না থাকলেও জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার প্রচেষ্টায় খালে দীর্ঘকাল পর জোয়ার ভাটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় খালটি পরিদর্শন করা হয়, গাছ লাগানো হয়, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয় এবং অনেক উন্নয়নের কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবায়নের খাতা শূন্য।
সাতক্ষীরা পৌরসভা প্রাণসায়েরের উন্নতি ও আধুনিকায়নের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার, কিন্তু তারাই যুগের পর যুগ খালের গলা চেপে ধরে বসে আছে। বড় বাজার থেকে নারিকেল তলা পর্যন্ত খালের দুই ধারে অবৈধ স্থাপনার কোনও কমতি নেই। যে যেভাবে পেরেছে খালের জায়গা দখল করে অবৈধ দোকান তৈরি করেছে, কিন্তু পৌরসভার পক্ষ থেকে কোনও অভিযান পরিচালনা করা হয় না। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বহু বছর পর পর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সব স্থানে নতুন স্থাপনা দাড়িয়ে যায় আরও শক্ত ভাবে।
২০২০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক প্রাণসায়ের খালের ধারের প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে খালটিকে উদ্ধার করার চেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখেনি। নাজমুল স্মরণীতে খালের ধারে অবৈধ দোকান গুলোকে সাতক্ষীরা পৌরসভা দীর্ঘ বছর ধরে নাম মাত্র মূল্যে ইজারা দিয়ে রেখেছে। এই দোকান গুলোর কারণে নাজমুল স্মরণীর সড়কটি খুবই সংকীর্ণ এবং সেই নব্বইয়ের দশক থেকে এই সড়কে যানজট লেগে থাকে। অথচ এই দীর্ঘ কয়েক যুগেও আমাদের পৌরসভা এই দোকান গুলোর জন্য আলাদা জায়গা বা একটি স্বতন্ত্র বহুতল মার্কেটের ব্যবস্থা করতে পারেনি। খালের ধারের এই দোকান গুলো অপসারণ করলে নাজমুল স্মরণীর সড়কটিকে আরও প্রশস্ত করা সম্ভব। খালের ধারে প্রশস্ত ওয়াক ওয়ে, বসার জায়গা ও বিনোদনের নানান উপকরণের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
আসলে সাতক্ষীরা পৌরসভা মুখে যাই বলুক প্রাণসায়েরকে আধুনিক করার ইচ্ছা তাদের কখনও ছিল না। প্রাণসায়েরের সৌন্দর্য ফেরাতে হলে ২০২০ সালের নকশা অনুযায়ী খালের দুই ধারের সকল দোকান, মসজিদ, স্থাপনা সহ সবকিছু উচ্ছেদ করতে হবে, নাজমুল স্মরণীর সড়কটি প্রশস্ত করতে হবে, খালের গভীরতা বাড়াতে হবে, খালের দুই পাড় ব্লক দিয়ে বাধাতে হবে, পেভার ব্লক দিয়ে প্রশস্ত ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে, টাইলস বাধানো আধুনিক ডিজাইনের সুন্দর বেঞ্চ বসাতে হবে, গাছ লাগাতে হবে এবং রাতের জন্য রঙ্গিন আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। কেষ্ট ময়রা, পাকাপোল, ও স্টেডিয়াম ব্রিজকে নতুন ভাবে ঢাকার হাতির ঝিলের মতো সুন্দর নকশায় তৈরি করতে হবে। তাহলেই ফিরবে সত্যিকারের প্রাণসায়েরের প্রাণ।
বর্তমানে গরিবের ওয়াক নির্মাণের মাধ্যমে যেগুলো হচ্ছে সেই গুলো শুধু সাতক্ষীরাবাসীর সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব। ঢাকার হাতির ঝিল, রাজশাহীর পদ্মার পাড়, খুলনার গল্লামারি, যশোরের ভৈরব নদীর পার সবই বদলে গেছে। শুধু বদলায়নি সাতক্ষীরার প্রাণসায়ের খালের পাড়। কারণ এখানের অযোগ্য কর্তা ব্যক্তিরা ব্যক্তি স্বার্থের উপরে উঠতে পারেনি। সাতক্ষীরার প্রাণ সায়ের খালের পাড় আর যশোরের ভৈরব নদীর পাড় একই রকম ছিল, কিন্তু সেখানের মেয়র ও জেলা প্রশাসকের যৌথ প্রচেষ্টায় সেই ভৈরব পাড় এখন সত্যিকারের প্যারিস হয়ে উঠেছে, আর আমাদের প্যারিস শুধু মুখে মুখে আর স্বপ্নে।
কোনও খাল, নদী বা সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অন্যতম একটি মাধ্যম হচ্ছে তার দুই ধার দিয়ে একই ধরনের গাছ লাগানো। যাতে গাছ গুলো একই রকমের দেখতে হয়, একই রকম লম্বা হয় এবং একই রকম পাতা ও ফুল ফুটে মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। কিন্তু আমাদের প্রাণসায়ের হয়ে গেছে গরীবের খাল। এখানে যখন যে আসে তখন সে একটি নিজের মতো করে গাছ লাগিয়ে যায়। কেউ আম, জাম, মেহগনি, শিশু, বাবলা সহ বিভিন্ন গাছ লাগিয়ে যায়। এই সকল গাছ বড় হলে কখনও খালের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে না। প্রাণসায়ের খাল হয়ে গেছে নিজের প্রচার প্রচারণার জায়গা। এখানে প্রায় বিভিন্ন পরিবেশ বান্ধব সংস্থা আসে এবং তারা দুইটি গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে চলে যায়। তাদের উদ্দেশ্য থাকে নিজের প্রচার ও প্রচারণা।
প্রাণসায়েরের আধুনিকায়নে জেলার রাজনৈতিক দল গুলোরও রয়েছে বড় দায়। এখানে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পাটি ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা প্রতিনিধিত্ব করলেও তারা খালের জন্য কিছু করেনি। বিএনপিসহ রাজনৈতিক দল গুলোর ইশতেহারেও প্রাণসায়ের খালের বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি বা বাস্তবায়ন দেখা যায় না। আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছর সাতক্ষীরা থেকে জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্ব করলেও তারা শহরের জন্য কিছু করেনি। একই সাথে বিএনপি এবং বিশেষ ভাবে জামায়াতে ইসলামীর জন্য সাতক্ষীরার মানুষ শুধু ত্যাগ ও ভোট নয়, জীবন ও রক্ত দিলেও তারাও সাতক্ষীরা শহরের জন্য কিছু করেনি। সাতক্ষীরা থেকে শুধু সবাই নিয়েছে, কিন্তু এখানেও কেউ কিছু দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।
সব মিলিয়ে প্রাণসায়ের খাল সাতক্ষীরার ঐতিহ্য ও শহরের জীবনের প্রতীক। এক সময় এটি শহরের উন্নয়নের মূল ছিল। আবারও যদি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা যায়, তবে এই খাল শহরকে আগের মতোই জীবন ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে পারবে। শুধু দরকার জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার শক্ত অবস্থান ও পরিকল্পিত সঠিক নকশার বাস্তবায়ন। সাতক্ষীরার নাগরিকদেরও উচিত সচেতন হওয়া এবং জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেয়া। এমন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা, যে শুধু মুখে নয়, বাস্তবেও স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে দেখায়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT