শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নড়াইলে নারী নৌকা বাইচ, সাংস্কৃতিক উৎসব  ও ফ্রি হেলথ ক্যাম্প  উদ্বোধন সাতক্ষীরায় খাবারে চেতনানাশক মিশিয়ে ৪৪ লাখ টাকার মালামাল লুট কিশোর গ্যাং: এর অপরাধ নিবে কার কাঁধে? নতুন কুঁড়ির সেরা ৪০ জনকে স্থায়ীভাবে বিকেএসপিতে ভর্তির আমন্ত্রণপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী খুমেক হাসপাতালের নতুন পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীকে নিজ হাতে লেখা কোরআন উপহার দিলেন ৯ বছরের শিশু কৃষিতে সফল উপকূলের নারীরা ভেরি বাধ ভাঙ্গার আতঙ্ক, এখনো ঘুমাতে পারে না উপকূলের মানুষ ফকিরহাটে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স প্রতিযোগিতার উদ্বোধন সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, চেপে বসেছে ‌দিনমজুরদের কাঁধে?

  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৮৪ পড়েছেন

বিশেষ প্রতিনিধি : পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবাঞ্ছিত চাপ পড়তে শুরু করে। তবে শুরুতে জনসংখ্যার স্বল্পতা, বনাঞ্চলের ভরপুরতা, কৃষিকেন্দ্রিক জীবিকা তথা জীবাশ্ম জ্বালানির অপ্রচলনের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে লক্ষ্যণীয় প্রতিকূল প্রভাব পড়েনি। যৎসামান্য হানিকর প্রভাব পড়লেও প্রাকৃতিক নিয়মে তার সংশুদ্ধি ঘটে যায়। তাই তখন পরিবেশ নিয়ে ভাবিত হবার কোনো কারণ ছিল না। সভ্যতার অগ্রগমনের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে। পরিবেশের উপর প্রতিকূল প্রভাবের মাত্রা বৃদ্ধি ক্ষিপ্রতা লাভ করে।
পশ্চিমা দেশে শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে পরিবেশের ওপর মানব কর্মকা- সৃষ্ট চাপ অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যার ভয়াবহতা ক্রমে আমাদের উদ্বেগের স্তর অতিক্রম করে প্রাণীকূলের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে এক অশনি সংকেতরূপে প্রকটিত হয়। শিল্পায়ন-নগরায়নের চাকা যে হারে অগ্রসর হতে লাগল সে হারে বনাঞ্চলের প্রাচুর্য হ্রাস হল। কলকারখানা ও যানবাহনের আকস্মিক সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির দহনের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকল। জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দহন বায়ুম-লে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রার উত্তরোত্তর সংযোজনে সহায়ক ভূমিকা পালন করল।
অপরদিকে ক্রম হ্রাসমান বনাঞ্চল বায়ুম-ল থেকে ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইডের যথাযথ বিয়োজনে অপারগ হয়ে পড়ল। ফলস্বরূপ বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড জমা হতে লাগল। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ধর্ম তাপ ধারণ তাই পুঞ্জীভূত এ গ্যাসের প্রভাবে বায়ুম-ল উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হতে লাগল। বিশেষ করে, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বায়ুম-লে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রাবৃদ্ধি নাটকীয় রূপ ধারণ করে। ‘গ্রিন হাউস গ্যাস’ আখ্যাত এ কার্বন-ডাই-অক্সাইড গোলকীয় উষ্ণায়নের মুখ্য ঘটক।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, পৃথিবীর কক্ষপথ, সমুদ্রস্রোত এবং আরো কিছু প্রাকৃতিক কারণে পৃথিবীর উষ্ণতার তারতম্য তথা জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে থাকে, যা আমাদের এ পৃথিবী নামক গ্রহের সৃষ্টিলগ্ন থেকে চলমান রয়েছে। তবে বর্তমানে উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এত উদ্বেগ এবং এত আলোচনার কারণ ভিন্ন। তা হলো, কোনো প্রাকৃতিক উপাদান নয় বরং মানুষের নানাবিধ কাজকর্মের ফলস্বরূপ বিগত বহু বছর ধরে বায়ুম-লের ক্ষতিকারক গ্যাস বিশেষ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রার সঙ্কটজনক বৃদ্ধি গোলকীয় উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন কাজকর্মের ফলে বায়ুম-লে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা এককথায় অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ।
শিল্প বিপ্লবের সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের জীবনশৈলী, পরিবেশ ও জলবায়ুতে পরিবর্তন আসে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানা, যানবাহন চালনা ইত্যাদির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ব্যাপক মাত্রায় শুরু হয়। অপরদিকে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে বনভূমি নিধন। মানুষের বিভিন্ন কাজকর্মের ফলে বায়ুমন্ডলে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড জমা হয়, তার শতকরা ৭৫ ভাগ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে আসে। বায়ুম-লে এ মারাত্মক হারে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রাবৃদ্ধিতে ‘গ্রিন হাউস গ্যাস এফেক্ট’ নামক প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায়।
শিল্প বিপ্লবের পর এক শতকের অধিক সময় অতিবাহিত হয়। ঐ দীর্ঘ সময়কালে পরিবেশ নিয়ে আমাদের উদ্বেগ তেমন প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে আমাদের উদ্বেগের আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭২ সালে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জাতিসংঘের বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে। পরিবেশ সম্পর্কে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ ঘটে ঐ সম্মেলনে।
সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে সুদীর্ঘ পর্যালোচনার পর যে বিষয়ে মতৈক্য সৃষ্টি হয় তা হল, গোটা পৃথিবীর পরিবেশ বর্তমানে তীব্র সঙ্কটাপন্ন এবং এর থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে আশু কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত না হলে অনতিকালের মধ্যে অবস্থা নিয়ন্ত্রণ অযোগ্য হয়ে পড়বে। এ গুরুতর সতর্কবাণী উচ্চারিত হবার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিবেশ নিয়ে নানা আলোচনা তথা সেমিনার, বিতর্ক, পদযাত্রা ইত্যাদির মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশের পালা শুরুহয়। পরিবেশ সচেতনতাকে জাগ্রত ও উন্নততর করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ৫ জুন দিনটিকে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ রূপে পালন করার প্রথা চালু হয়।
পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, ব্রাজিলের রাজধানী রিও-ডি-জেনিরিও-তে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলন, যা ‘ঊধৎঃয ংঁসসরঃ’ নামে পরিচিত। স্থূল কলেবরের এ সম্মেলনে বিশ্বের ১৬০টি দেশের প্রায় ৮ হাজার প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। পরিবেশ সম্পর্কে এত দীর্ঘ ও বিস্তৃত আলোচনা ইতোপূর্বে আর হয়নি। উক্ত সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা পরিবেশ রক্ষার্থে যেসব বিষয়ে সহমত পোষণ করেন তা অতি তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন। এর মধ্যে অন্যতম হল পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
সাম্প্রতিক কালে উষ্ণায়ন এবং তৎসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জি-আট সম্মেলনে বিষয়টি আলোচ্য সূচিতে গুরুত্ব পায়। ১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলনের পর দীর্ঘ চার দশক অতিক্রান্ত। এ সময়কালে পরিবেশ রক্ষায় প্রভাবী পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা কতটুকু সমর্থ হয়েছি বা বিভিন্ন সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলো কতটুকু অনুসৃত হয়েছে সে ব্যাপারে আত্মতুষ্টির তেমন অবকাশ না থাকলেও ইত্যবসরে যে ইতিবাচক দিকটি ধরা পড়েছে তা হল পরিবেশ চিন্তা আজ সারা বিশ্বে এক সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ ও তার সফল রূপায়নে এ উপলব্ধি অবশ্য সহায়ক হবে। কেননা যে কোনো গভীর সমস্যা সমাধানের প্রাক শর্ত হল সমস্যা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জন।
উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে এক গোলকীয় সমস্যার রূপ ধারণ করেছে। মানব জীবনের কোন দিক যে এর কু-প্রভাব মুক্ত থাকতে পারবে না তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর কু-প্রভাবে নিত্যনতুন স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব বিষয়ে ইতোমধ্যে যেসব তত্ত্ব ও তথ্য আমাদের গোচরে এসেছে তা একজন পরিবেশ সচেতন মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেবার পক্ষে যথেষ্ট।
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে পৃথিবীর বায়ুম-লে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। দেখা গেছে, বায়ুম-লে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ১৮৫০ সালের পিপিএম ২৯০ (পার্টস পার মিলিয়ন) থেকে বেড়ে ১৯৭৯ সালে দাঁড়ায় ৩৩৪ পিপিএম। ঊর্ধ্ব এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ বায়ুম-লে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ১৯৭৯ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হবার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। ফলস্বরূপ গোলকীয় উষ্ণায়নের মাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, যার ভয়াবহ প্রভাব থেকে মানুষসহ গাছপালা, পশু পাখি কিছু রেহাই পাবে না। বলাবাহুল্য, উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের এ ভয়াবহতা ইতোমধ্যে আমরা উপলব্ধি করতে শুরু করেছি।
উষ্ণায়ন মানুষ তথা অন্যান্য প্রাণীকূলের শরীর ও স্বাস্থ্যে মারাত্মক রকমের প্রতিকূল প্রভাব ফেলে থাকে। প্রত্যক্ষভাবে উষ্ণায়ন সৃষ্ট হিটওয়েভ বা তাপ প্রবাহের কবলে পড়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর হার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া এর পরোক্ষ ফল হিসেবে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে চলেছে। উষ্ণায়নের ফলে চর্ম, ফুসফুস সম্বন্ধীয় বিভিন্ন জটিলতা ও রোগ সৃষ্টি হতে পারে। গোলকীয় উত্তাপ বিশ্বে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে বলে বিজ্ঞানীরা অনেক পূর্বে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। দেখা যাচ্ছে, যত দিন যাচ্ছে তত উষ্ণায়ন সৃষ্ট ব্যাধির কথা প্রকাশ্যে আসছে।
সম্প্রতি টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, আসন্ন বছরগুলোতে উষ্ণায়নের পরিণতি স্বরূপ এক বিরাট সংখ্যক আমেরিকাবাসী কিডনি স্টোনের সমস্যায় ভুগবেন। প্রখর উত্তাপের ফলে শরীর থেকে অত্যধিক ঘাম বেরিয়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করার জন্য কিডনিতে পাথর হতে পারে। গবেষকদের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ কিডনি স্টোন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বর্তমান ১৬ লক্ষ থেকে বেড়ে ২২ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে যার ফলে চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হবে অন্যূন এক বিলিয়ন ডলার। গবেষকদের এ তথ্য আমেরিকা-সমন্ধীয় হলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশও যে অনুরূপ সমস্যায় জর্জরিত তা বলাবাহুল্য।
শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীও গোলকীয় উষ্ণায়নের বিরূপ প্রভাবে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রভাবিত। জীববৈচিত্র সম্পর্কিত গবেষণা থেকে জানা যায়, ফসিল রেকর্ড রয়েছে এমন যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে দ্রুতবেগে বিভিন্ন প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের এ দ্রুত বিনাশ নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত। গোলকীয় উষ্ণায়নের বিরূপতায় প্রাণীকূলের মতো উদ্ভিদকূলও সমানভাবে অপকৃত। উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজননে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল লক্ষিত হয়। অনেক উদ্ভিদ পরিবর্তিত অবস্থা মানিয়ে নিতে পারে না। বিষয়টির গভীরতা উপলব্ধি করতে একটি উদাহরণের উপস্থাপনা প্রাসঙ্গিক হবে। সাম্প্রতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন ফুলের মনমাতানো আকর্ষণীয় সুগন্ধ দিন দিন কমে আসছে। হয়তো এমনো দিন আসবে যখন ফুলের গন্ধ একেবারে হারিয়ে যাবে।
উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের আর্থ-সামাজিক প্রভাব কত ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী তার ধারণা অত্যন্ত দূরূহ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ুর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ুর অবাঞ্ছিত পরিবর্তনের ফলে কোথাও প্রচ- খরা আবার কোথাও প্রবল বর্ষণ ও বন্যা ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। উদ্বেগের বিষয় হল, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব লক্ষিত হচ্ছে খাদ্যশস্য উৎপাদনে। খরা-বন্যা দু’য়ের ফলে কৃষির উৎপাদন সরাসরি ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সরকারি কোষাগারের সংকোচন ঘটছে, বিঘিœত হচ্ছে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের রূপায়ণ। কৃষিজ সামগ্রীর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্পের উপর, কেননা অধিকাংশ শিল্প-কারখানা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে যে সত্যটি প্রতিভাত হয় তা হল উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে নিছক এক পরিবেশ সমস্যা নয়, তা আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা, জনস্বাস্থ্য আদি যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিশ্বজলবায়ু পরিবর্তনে বিরুপ প্রভাবে সমগ্র পৃষ্টের উচ্চতা ও পানিতে লবনাক্ততার পরিমান বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবন উপকূলীয় জীব বৈচিত্র হুমকির মুখে। দিনের পর দিন বিস্তির্ন বনাঞ্চল পানিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ সংকীর্ন হচ্ছে দেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ বনাঞ্চল। ফলে অবস্থার উন্নতি না হলে আগামী ২১০০ সালের মধ্যে সমগ্র সুন্দরবন অঞ্চলের শত ভাগ তলিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা বিশেষ্ণদের।
সূত্র মতে সমগ্র সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারতে বিস্তৃত। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের পানিতে মাত্রারিক্তভাবে লবনাক্ততার পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রের তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত দেড় দশকে সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গায় ইতোমধ্যে ১/২ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন পরীক্ষার এক রিপোট সূত্রে জানা যায়, সংশিষ্ট বিষয়ে দ্রত পদক্ষেপ গ্রহন না করলে ১০ বছরের মধ্যে সমগ্র বনাঞ্চলের ১৫ শতাংশ তলিয়ে যাবে। জাতিসংঘের এক গবেষণা রিপোটে জানা যায়, সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা ১০ সে. মি বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনে ১৫ শতাংশ, ২৫ সে.মি. বৃদ্ধি পেলে ৪০ শতাংশ, ৪৫ সে.মি. বৃদ্ধি পেলে ৭৫ শতাংশ এবং ৬০ সে.মি. বৃদ্ধি পেলে সমগ্র সুন্দরবন পানিতে ডুবে যাবে। সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সাগর বক্ষে জেগে উঠা নয়নাভিরাম তালপর্টি ইতোমধ্যে সাগর বক্ষে তলিয়ে গেছে। তাছাড়া গহীন সুন্দরবনে পশ্চিম বন বিভাগের মান্দারবাড়ীয়া কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। সুন্দরবনের ভেতরে ছোট ছোট নদী খালগুলোতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি প্রবাহ কমে গেছে। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে বিচিত্র প্রানী জগতের বিচরণ ক্ষেত্র। ১৯২৭ সালে বন আইনে বনজ সম্পদ আহরনের দিক নির্দেশনা থাকলে ও অন্যন্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৫৫ সালে নতুন নীতি মালা ঘোষিত হয়ে পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে পুনরায় সংশোধিত হয়। কিন্তু এ দুটি নীতিমালায় বনজ সম্পদ রক্ষ্যায় স্পষ্টভাবে কিছুই বলা হয়নি। সর্বশেষ ১৯৭৯ সালে বননীতি মালা ও ছিল অস্পষ্ট। পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে বন আইনে নীতিমালা সংশোধিত হলেও তা বনজ সম্পদ রক্ষ্যা, আহরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনে বিরুপ প্রভাবে ধারনা ও ছিল অপযাপ্ত। নিউইয়ক টাইমসের প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতিনিয়ত পোড়ানো হচ্ছে জীবাশ্ন জ্বালানী। বৃদ্ধি পাচ্ছে মাত্রারিক্ত কার্বন। বৃদ্ধি পাচ্ছে তাপমাত্রা বৈশ্বিক উঞ্চতা। মানব সৃষ্টি এসব কর্মকান্ডে দিন দিন ফুসে উঠছে সমুদ্র। আঘাত হানছে সামুদ্রিক ঝড়, পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু। এ জলবায়ু পরিবর্তনে চরম ঝুঁকির মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। ঝুঁকিতে আছে এই অঞ্চলের ১০ লক্ষাধিক মানুষ্ কার্বন নিসরনে বাংলাদেশের ভুমিকা (গ্রীন হাউস) মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ। কার্বণ নিসরনে আমরা পিছিয়ে থাকলেও ঝঁকিতে আমরা এগিয়ে আছি। সূত্র মতে ২১০০ সাল নাগাত সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা ৩ ফুট বৃদ্ধি পাবে। তখন লবনাক্ত পানিতে তলিয়ে যাবে সমুদ্র উপক‚লীয় অঞ্চল। ঘরবাড়ি ছাড়া হবে বাংলাদেশের ১০ লক্ষাধিক মানুষ। আবহাওয়া বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমান জানান, সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বাড়ার কারনে ২০৫০ সাল নাগাত বাংলাদেশের উপক‚লীয় এলাকার ১৭ শতাংশ জমি তলিয়ে যাবে। বাস্তহারা হবে ১ কোটি ৮০ হাজার মানুষ। পৃথিবী শ্রেষ্ট ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সাথে জড়িয়ে আছে দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের অস্থিত পরিবেশ ও প্রতিবেশ। দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সুন্দরবনের উপর কম বেশি নির্ভরশীল। ভবিষ্যত প্রজম্মকে একটি সুস্থ পরিবেশ সম্পন্ন দেশ উপহার দিতে এবং সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন বনজ ও মৎস্য সম্পদের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের পথ সুগম করতে মায়ের মত সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখা অতি জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের নানাবিধ সমস্যায় ফেলে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো কঠিন পরিস্থিতি সম্মুখীন হতে হবে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসময়ে অনাবৃষ্টি, বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়সহ অতি গরম আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। যখন আমাদের আবহাওয়া আরো উত্তপ্ত হবে তখন সমুদ্রের পানি আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠতে থাকবে। ফলে বাংলাদেশের অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে আমাদের উপকূলীয় এলাকা এবং সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারসহ অন্যান্য এলাকা। দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে অতিবাহিত হতে পারে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই জনসংখ্যার জন্য কৃষি জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ বাড়ছে। ফলে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। গাছগাছালি কেটে ফেলতে হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প কারখানা স্থাপন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইটভাটার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই ইট ভাটার কালো ধূয়া পরিবেশকে মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব আমাদের শ্বাস কষ্টসহ শরীরের এলার্জির সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। নানা ধরনের রোগব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। কল কারখানার বর্জ্যগুলি নদীতে চলে যাচ্ছে, ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। আবার এই পানি আমরা ব্যবহারের কারণে শরীরে নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এক হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের এখনো জলবায়ুর পরিবর্তন ব্যাপক আকার ধারণ করেনি, তবে আমরা যদি এখনই এর থেকে উত্তরণের জন্য সচেষ্ট না হই তাহলে সামনে অনেক বড় সংকটের মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইটভাটার জন্য মাটি সংগ্রহের কারণে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমি কমে যাওয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে যাওয়া, পলিথিন এবং অন্যান্য বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, পশু পাখি কমে যাওয়া, বনাঞ্চল কমে যাওয়া, বিল্ডিং বেড়ে যাওয়া, কৃষি জমি কমে যাচ্ছে এছাড়াও নানামাত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। আগে আমরা জৈব সার ব্যবহার করার কারণে আমাদের জমিগুলো উর্বর থাকতো। আমরা কৃত্রিম সার ব্যবহার করার কারণে সাময়িকভাবে উপকার পেলেও জমির উবরর্তা ঠিকই হ্রাস পাচ্ছে। নদী নালা ভরাট করা হচ্ছে নানা কারণে। ফলে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতেও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নদী ভাঙ্গন ব্যাপক আকার ধারণ করছে। শরীয়তপুরে অনেক এলাকা ভেঙ্গে যাচ্ছে। যার কারণে পানির সঠিক প্রবাহ স্থির হতে পারছে না। দিনে দিনে নদীর ভাঙ্গন বাড়ছে। আমরা লেকগুলোর উপরে বাড়ি ঘর নির্মাণ করছি। ফলে ঐ এলাকার বায়ু অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। অতি গরমের কারণে এসি ব্যবহার বাড়ছে।
বাংলাদেশের জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় বেশি করে বনাঞ্চল বাড়াতে হবে এবং অল্প জায়গা ব্যবহার এবং বহুতল বিল্ডিং এবং শিল্পকারখানা স্থাপন করতে হবে। যাতে পরিবেশের কোন ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন করে তা নির্দিষ্ট স্থানে জমা রাখতে হবে এবং এই বর্জ্য থেকে রিসাইকেলিং করে কীভাবে অন্যকাজে লাগানো যায় এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হবে। কল কারখানার কালো ধূয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই এখন থেকে গ্রিন ফ্যাক্টরির উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে করে পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য এবং পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হবে। এই প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য সহজে নষ্ট হয় না, যার কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌর বিদ্যুৎ পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।
ট্যানারি বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। ট্যানারির বর্জ্য যাতে করে খাল-বিল নদী-নালায় না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ট্যানারি বর্জ্য খাল-বিল নদী নালায় চলে গেলে নানান রোগ-ব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধন করে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে।
শিল্প কল কারখানা করতে লক্ষ রাখতে হবে যেন কৃষি জমি নষ্ট না হয়। অল্প জায়গা ব্যবহার করে শিল্পকারখানা তৈরি করতে হবে। শিল্পকারখানার আশেপাশে গাছগাছালি লাগানো বা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি জমি ধ্বংস না করে বহুতল বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে চাহিদা বেড়ে যায়। তাই জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণে আলাদা বাসা বাড়ি করতে হবে। কৃষি জমি কমে যায়, তাই অধিক সন্তান না নিয়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেন না হয় সে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছিলো বাংলাদেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মানুষ। ২০২২ সালের জুনে এ জেলা দুটির অধিকাংশ মানুষ বন্যার পানিতে আটকে পড়ে। এই দুই জেলায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ ক্ষতিগস্ত হয়েছিলো। মানুষকে উদ্ধারে সিলেট এবং সুনামগঞ্জের আটটি উপজেলায় সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিলো। বন্যার পানিতে তলিয়ে সুনামগঞ্জ শহর পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। জেলার ৭০ হাজারের মতো মানুষ দুইশ বিশটি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিলো। সিলেটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বন্যার পানি প্রবেশ করায় ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। ওসমানী হাসপাতালে নিচের তলায় পানি ওঠায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিলো। রোগীসহ সকল কার্যক্রম উপরের তলায় সরিয়ে নিতে হয়েছিলো। বন্যার কারণে রেল স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়েছিলো। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও টেলিযোগাযোগ বিঘিœত হওয়ার কারণে সকল প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছিলো। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের অধিকাংশ জেলার ওপর দিয়ে তীব্র থেকে মাঝারি তাপদহ বয়ে য়ায়। তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রির আশেপাশে, কিন্তু অনুভূত হচ্ছিল ৪৫ ডিগ্রির উপরে। এসবই ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।
এ শতাব্দীতে নতুন কিছু পাওয়ার আশায় পৃথিবীর মানুষ। কালের পরিক্রমায় মানুষের এমন চাহিদা অমূলক নয়। কিন্তু সব চাহিদাকে পাশ কাটিয়ে একটি খবরে সরব পৃথিবী। চারিদিকে একটাই আলোচনা, একটাই কথাÑ ‘জলবায়ু পরিবর্তন’। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে হুমকির সম্মুখীন আজ সারাবিশ্ব। এই হুমকি মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই, এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, সবাইকে একযোগে দাঁড়াতে হবে বিপর্যয় রুখতে। বর্তমানে বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে ০.৫৬ শতাংশ অবদান রাখে, তবু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশের ক্ষতির অনুপাত অপ্রতিরোধ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ক্ষয়, খরা, তাপ এবং বন্যাÑসবই আমাদের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। আমাদের অবকাঠামো এবং কৃষিশিল্প ধ্বংস হচ্ছে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতি এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ, হ্রাস ও মোকাবিলায় যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে আমাদের জিডিপি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং গড় আয় ২১০০ সালে ৯০ শতাংশ কম হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। আন্তসরকারি প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টে ধারণা করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্য প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। জলবায়ু তার নিজ অবস্থানে স্থির থাকে না। এটা সর্বদা পরিবর্তনশীল। তাহলে এটা নিয়ে এত মাতামাতি কেন? মাতামাতির কারণ রয়েছে। বিশ্ব জলবায়ুর স্বাভাবিক পরিবর্তন এখন আর দেখা যাচ্ছে না। পরিবর্তনের মাত্রা খুব বেশি। জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকির ক্ষেত্রে বংলাদেশ সম্পর্কে আশঙ্কা দেশের বৃহৎ অংশ কোনো একসময় সমুদ্রের গর্ভে হারিয়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশ সম্পর্কে এ সংকটের আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়ার আগেই প্রয়োজন প্রতিরোধ।
আমরা যে পরিবেশে বাস করি, সেই পরিবেশের প্রতিটি মুহূর্ত অনন্য। ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তিত হতে থাকে সেই পরিবেশের অবস্থা। যেমন: কখনো যদি রোদের তীব্রতা দেখতে পাই তো আবার কখনো মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। এভাবে শীত, বৃষ্টি, গরম, ঝড় প্রভৃতি বায়ুম-লের অবস্থা পরিবেশকে অনন্য করে তোলে। জলবায়ু হলো দৈনন্দিন আবহাওয়ার দীর্ঘদিনের সাধারণ অবস্থা, গড় আবহাওয়া নয়। জলবায়ুর উপাদানগুলো হলো তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ু, মেঘ, বৃষ্টিপাত, তুষারপাত, বায়ুচাপ প্রভৃতি। একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক অবস্থা ওই দেশের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
আবহাওয়া ও জলবায়ুর চারটি উপাদান যথা: বায়ুর চাপ, বায়ুর তাপ, বায়ুর আর্দ্রতা ও অধঃক্ষেপণ, ঝড়ঝঞ্ঝা। পৃথিবীর মধ্যাকষর্ণে বায়ুম-ল ভূপৃষ্টে যে চাপ প্রয়োগ করে, তাই বায়ুর চাপ। সমুদ্র সমতলে বায়ুর চাপের পরিমাণ প্রতিবর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ১৪.৭ পাউন্ড। ৪৫ অক্ষাংশের সমুদ্র সমতলে ব্যারোমিটারে এর মাপ ২৯.৯২ ইঞ্চি। সমুদ্রে বায়ুম-লের ওজন প্রায় ৫ হাজার ৬০০ ট্রিলিয়ন টন। এই বায়রু চাপ পরিবতির্ত হয়ে থাকে বেশ কয়েকটি কারণে, এর মধ্যে অন্যতম তাপ। উষ্ণতার তারতম্যের কারণে বায়ুর চাপ পরিবর্তিত হয়। জলবায়ুর এ উপাদানগুলো পরিবর্তনের কিছু নিয়ামক আছে। সূর্যের কৌণিক অবস্থান জলবায়ুর অন্যতম নিয়ামক। তির্যকভাবে সূর্য আলো দিলে বেশি বায়ুম-ল ভেদ করতে হয়; কিন্তু লম্বভাবে সূর্য কিরণ দিলে তা অনেক বেশি প্রখর হয়, যা বায়ুর তাপের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে থাকে। তাছাড়া ভূপৃষ্ঠের ৭০.৮ শতাংশ পানি এবং ২৯.২ শতাংশ স্থল। সূর্যের তাপ পানির ৬০০ ফুট পর্যন্ত এবং স্থলভাগে ৬০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছে। ফলে পানি অনেক বেশি উত্তপ্ত হয় এবং এই উত্তপ্ত পানি এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গেলে সেই অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বায়ুপ্রবাহও জলবায়ুর অন্যতম নিয়ামক, উষ্ণ স্থানের বায়ু শীত অঞ্চলে গেলে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার শীত অঞ্চলের বায়ু উষ্ণ অঞ্চলে গেলে সেই অঞ্চলের বায়ু শীতল হয়ে ওঠে। এভাবে এ বিষয়গুলো দ্বারা জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর জলবায়ু যে পরিবর্তিত হচ্ছে, এ বিষয়ে আগে কোনো ধারণাই ছিল না। যখন জানা গেল পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাম্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন থেকেই মানুষের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে ১৮ এবং ১৯ শতকে। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আমরা প্রথম সতর্কতা সংকেত পাই গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে যখন হাওয়াইতে কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিমাপ করা হয় এবং এর পর নিতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT