শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১৪ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কিশোর গ্যাং: এর অপরাধ নিবে কার কাঁধে? নতুন কুঁড়ির সেরা ৪০ জনকে স্থায়ীভাবে বিকেএসপিতে ভর্তির আমন্ত্রণপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী খুমেক হাসপাতালের নতুন পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীকে নিজ হাতে লেখা কোরআন উপহার দিলেন ৯ বছরের শিশু কৃষিতে সফল উপকূলের নারীরা ভেরি বাধ ভাঙ্গার আতঙ্ক, এখনো ঘুমাতে পারে না উপকূলের মানুষ ফকিরহাটে নতুন কুঁড়ি স্পোটর্স প্রতিযোগিতার উদ্বোধন সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ যশোরে দুই মাদক ও অস্ত্র মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবনসহ ১৭ বছরের কারাদণ্ড যশোরে দুই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

মিয়ানমারের জান্তার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ৫ বছরে গৃহযুদ্ধে নিহত ১ লাখের বেশি

  • প্রকাশিত সময় : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৫ পড়েছেন

ডেস্ক রিপোর্ট : মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে সব পক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অভ্যুত্থানের পর থেকে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট প্রাণহানির সংখ্যা ১ লাখ ১৪ জনে পৌঁছেছে।
থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর খবরে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চিকে আটক করা হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রায় এক দশক ধরে চলা গণতন্ত্রের পরীক্ষামূলক যাত্রারও সমাপ্তি ঘটে।
অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ দমনে জান্তা নিরাপত্তা বাহিনী প্রাণঘাতী অভিযান চালায়। এরপর বহু আন্দোলনকারী শহর ছেড়ে গিয়ে গণতন্ত্রপন্থী গেরিলা বাহিনী গঠন করেন। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা যুদ্ধ শুরু করেন।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ জনে। সংস্থাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সহিংসতার খবর সংগ্রহ করে এই হিসাব প্রস্তুত করে।
মিয়ানমারে এ বিষয়ে কোনো সরকারি মৃত্যুর হিসাব নেই এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুমানেও পার্থক্য রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ বছরের এই গৃহযুদ্ধ বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সক্রিয় সংঘাত। গত মাসে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলায় স্বামীকে হারানো ৪৯ বছর বয়সী থেইন আই নু বলেন, ‘এই যন্ত্রণা যেন শেষই হচ্ছে না।’
থেইন আই নু আরও বলেন, ‘আমার মধ্যে গভীর ক্ষোভ আর প্রচণ্ড রাগ জমে আছে। কিন্তু এখন আর জানিই না, কার ওপর রাগ করব। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য মেনে নিয়েই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে।’
‘সে রেখে গেছে অসংখ্য স্মৃতি’
অভ্যুত্থানের পর টানা পাঁচ বছর সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নির্দেশেই শাসিত হয়েছে মিয়ানমার। চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে অনুষ্ঠিত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে দাউ অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) প্রধান বিরোধী দলগুলোকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে ভোট গ্রহণও সম্ভব হয়নি।
গণতন্ত্র পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মতে, নির্বাচনটি ছিল মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনকে নতুন রূপে বৈধতা দেওয়ার একটি প্রহসন। অন্যদিকে বিদ্রোহীরা তাঁর নতুন শান্তি আলোচনার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ভাবমূর্তি পরিষ্কার করার জন্যই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
মধ্যাঞ্চলের মাগওয়ে অঞ্চলের মিয়িত চে শহরের এক ব্যক্তি, যার কিশোর ছেলে সম্প্রতি নিহত হয়েছে, বলেন, ‘অভ্যুত্থান না হলে শিশুরা আজ স্কুলে পড়াশোনা করত।’ তিনি জানান, তাঁর ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গণতন্ত্রপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল এবং পরে যুদ্ধে নিহত হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা ঠিকমতো বৌদ্ধ ধর্মীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রার্থনাটুকুও করতে পারিনি। চারদিকে তখন ভারী কামানের গোলাবর্ষণ চলছিল’ তিনি আরও বলেন, ‘সে রেখে গেছে অসংখ্য স্মৃতি। তার জন্য আমি যে এত কম করতে পেরেছি, তাতে আমার কোনো তৃপ্তি নেই।’
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মিয়ানমারে ৩৭ লাখের বেশি মানুষ নিজ দেশেই বাস্তুচ্যুত। একই সঙ্গে প্রতি পাঁচজনের একজন তীব্র খাদ্যসংকটের মুখোমুখি। দেশটি আবারও দারিদ্র্যের দিকে পিছিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গুনে সহিংসতা অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেখা যায়।
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলছে। কোথাও কোথাও প্রতিদিনই সামরিক বাহিনীর রাশিয়া ও চীনের সরবরাহ করা যুদ্ধবিমান থেকে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সংঘাতের দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ছিল মিয়ানমার। এ ক্ষেত্রে শুধু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডই তার চেয়ে এগিয়ে ছিল।
সংস্থাটি জানিয়েছে, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে ১ হাজার ২০০টির বেশি পৃথক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি ‘বিশ্বের সবচেয়ে খণ্ডিত সংঘাত।’ এসিএলইডির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সু মোন বলেন, ‘এটি ভয়াবহ প্রাণঘাতী। বেসামরিক মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংঘাত এখন পুরো দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।’
সময়ভেদে যুদ্ধের পরিস্থিতি কখনো এক পক্ষের, কখনো অন্য পক্ষের অনুকূলে গেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যৌথ অভিযান বড় ধরনের সাফল্য এনে দেয়। তারা দ্রুত অগ্রসর হয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের দিকে এগিয়ে যায়। এমনও জল্পনা শুরু হয়েছিল, তারা হয়তো প্রাচীন রাজকীয় রাজধানীটিও দখল করে নিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আবার সামরিক বাহিনীর অনুকূলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ, চীন প্রকাশ্যে তাদের সমর্থন দিয়েছে এবং বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে।
‘তাদের শুধু মরার জন্যই পাঠানো হচ্ছে’
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ চালু করে সেনাবাহিনী। তাদের লক্ষ্য, প্রতিবছর জোরপূর্বক ৫০ হাজার নাগরিককে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা। সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পাওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা এক সাবেক সেনাসদস্য বলেন, ‘এই নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা কিছুই করতে পারে না। মনে হয়, তাদের শুধু মরার জন্যই পাঠানো হচ্ছে।’
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২০ বছর বয়সী ওই তরুণ বলেন, ‘এক জায়গায় যদি না-ও মরেন, তাহলে আপনাকে আরেক জায়গায় পাঠানো হবে।’ মরার আগপর্যন্ত এই স্থানান্তর চলতেই থাকবে।
এই যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশের বাইরেও পড়েছে। এর ফলে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানুষের ঢল নেমেছে। একই সঙ্গে আন্তদেশীয় অপরাধী চক্রগুলোর জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধে জড়িত সব পক্ষই হেরোইন ও মেথামফেটামিনের মতো মাদকের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন থেকে বিপুল অর্থ আয় করে নিজেদের যুদ্ধ তহবিল সমৃদ্ধ করছে।
এদিকে দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো অনলাইন প্রতারণা চক্রের অন্যতম ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এসব প্রতারণা কেন্দ্রের অনেকগুলোই শক্তিশালী নিরাপত্তাবেষ্টিত কম্পাউন্ডে পরিচালিত হয়, যেখানে জান্তাপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাহারার দায়িত্বে থাকে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT