বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

জলবায়ুর প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরা

  • প্রকাশিত সময় : বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৫ পড়েছেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বসবাস করছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষ। সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে তাদের জীবন ও জীবিকা। লবণাক্ততার কারণে কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না, হালের পশু ও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর খাদ্যের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে উপকূলের চাষযোগ্য জমি হারাচ্ছে ঊর্বরতা। এছাড়া প্রতিনিয়ত এই অঞ্চলের মানুষকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে স্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন সমস্যা ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৮১ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ ১লাখ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। আর পতিত জমি রয়েছে ৪০ হাজার ৯৮১ হেক্টর। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় সাতক্ষীরায় বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এতে ক্রমেই আমন ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গত চার বছরের ব্যবধানে আমন ধান উৎপাদন কমেছে ৩৩ হাজার টন।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০১৯-২০ মৌসুমে এ জেলায় রোপা আমন চাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬ টন, ২০২০-২১ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন, ২০২১-২২ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২লাখ ৪৬ হাজার ৭২৮ টন এবং ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় আমন চাল উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৮ টন। সেই হিসাবে ২০১৯-২০ মৌসুমের তুলনায় ২০২২-২৩ মৌসুমে ৩৩ হাজার ২৩৮ টন উৎপাদন কমেছে। কৃষির মতো সাতক্ষীরার সড়কগুলোতেও ফুটে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেছে। কয়েক বছরে মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এ কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে হাজার হাজার রেইনট্রি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. নাসরিন আক্তার জানান, রেইনট্রি গাছ মরে যাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাটির লবণাক্ততা ও ক্ষার বেড়ে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। সময়মত বৃষ্টি হচ্ছে না। মৌসুমি বৃষ্টি না হলে খাদ্যসংকটে পড়ে রেইনট্রি। তবে বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও গাছ মরে যেতে পারে বলে জানান তিনি।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে উপকূলে। এতে সহায়-সম্পদ হারানোর পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসার অভাব, নারী-শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। উপকূলের এমন অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৯ সালের আইলার পর থেকে গত ১৫ বছরে এক ডজনের বেশি দুর্যোগের কবলে পড়েছে উপকূলের এ জেলা। এর মধ্যে উলে­খযোগ্য ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’, ২০১৩ সালের ‘মহাসেন’, ২০১৫ সালের ‘কোমেন’, ২০১৬ সালের ‘রোয়ানু’, ২০১৭ সালের ‘মোরা’, ২০১৯ সালের ‘ফণী’, ২০১৯ সালের ‘বুলবুল’, ২০২০ সালের ‘আম্পান’, ২০২১ সালের ‘ইয়াস’, ২০২২ সালের ‘অশনি’ ও ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’
প্রতিবছরই ছোট-বড় মিলিয়ে তিন-চারটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয় সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। এতে জেলার উপকূলবর্তী তিন উপজেলা শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও আশাশুনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট নদীভাঙনে গত কয়েক বছরে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বহু কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে ওই তিন উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম। এতে সহায়-সম্বল হারিয়ে বাসস্থান ছেড়েছেন অনেক মানুষ।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, উপকূলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের শিশুরা শৈশবের ডানা মেলে অপুষ্টি আর অশিক্ষায়। জলবায়ু পরিবর্তন এ জেলার পুষ্টিহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে জানা যায়।
বিগত ২০১৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত বিষয়ে সাতক্ষীরার দু’টি উপকূলীয় উপজেলা নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ বছরের প্রায় সাত মাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটায় অবস্থান করেন। আর এ সময় ওই সব পরিবারের শিশু সন্তানরা শিক্ষা থেকে পিছিয়ে যায়। জড়িয়ে পড়ে শিশুশ্রমে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও পুষ্টির অভাব শিশুদের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে এ জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩৩হাজার ৯৩৭ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিল। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২২ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২৬ হাজার ৪৮৭জন। অর্থাৎ ওই ব্যাচের কমপক্ষে ৭ হাজার ৪৫০জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। আর এই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম একটি কারণ বলে জানান সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা।
সুন্দরবন ঘেষা শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার বাসিন্দা হুদা মালী বলেন, খরা, ঝড়, বৃষ্টি ও নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আইলার পর থেকে গোাঁ এলাকা উদ্ভিদশূন্য। লবণাক্ততার কারণে সব গাছ মারা গেছে। এলাকায় বসবাস করা খুবই কষ্টের। সব সময় সুপেয় পানির অভাবে থাকতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাতক্ষীরার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে। ঘূর্ণিঝড় আইলার তান্ডবের পর সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলাগুলোর বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র হয়। নষ্ট হয়ে যায় সুপেয় পানির উৎস।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, প্রতি লিটার পানিতে শূন্য থেকে ১হাজার মিলিগ্রাম লবণ থাকলে সে পানি পানযোগ্য। কিন্তু উপকূলে প্রতি লিটার পানিতে ১হাজার থেকে ১০ হাজার মিলিগ্রাম লবণ রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সাতক্ষীরার ১৩ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছেন বলে জানানো হলেও বাস্তবে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লির্ডাস, ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ডসহ জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের তথ্যমতে, জেলার ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮১জন মানুষের মধ্যে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ সুপেয় পানির সংকটে রয়েছে।
জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ¡াস, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা উপকূলের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতের সময় অধিক শীত, গ্রীষ্মে প্রচন্ড গরম এবং বর্ষায় অতিবৃষ্টির ফলে দুর্ভোগ বাড়ছে। এ ছাড়া জলোচ্ছ¡াসে নদীভাঙনে এসব এলাকার বহু মানুষ উদ্বাস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রভাবের কারণে বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরার মানুষ রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রা অনুভব করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জলবায়ু ‌পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেছে। কয়েক বছরে মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এ কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে প্রায় দেড় হাজার রেইনট্রি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। রাস্তার দুই পাশে থাকা সারি সারি এ গাছগুলো এখন বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ডাল ভেঙে আহত হচ্ছেন পথচারীরা। প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেছে। কয়েক বছরে মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এ কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে প্রায় দেড় হাজার রেইনট্রি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। রাস্তার দুই পাশে থাকা সারি সারি এ গাছগুলো এখন বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ডাল ভেঙে আহত হচ্ছেন পথচারীরা। প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন। সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে ডাল ভেঙে হতাহতের শঙ্কায় এ পথে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. নাসরিন আক্তার জানান, রেইনট্রি গাছ মরে যাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাটির লবণাক্ততা ও ক্ষার বেড়ে যাওয়া। তাছাড়া প্রত্যেক গাছের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। মৌসুমি বৃষ্টি না হলে রেইনট্রি গাছ খাদ্য সংকটে পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও গাছ মরে যেতে পারে।
বছরখানেক আগে সাতক্ষীরার সড়ক থেকে মারা যাওয়া রেইনট্রি গাছগুলো অপসারণের উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ। তারা এগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও এতদিনেও সেগুলো কাটতে পারেনি জেলা পরিষদ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ ও সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার কারণে সড়কটি অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা-আশাশু‌নি সড়কের ধু‌লিহর বাজারের পাশে কয়েক মাস আগে ডাল ভেঙে স্কুলছাত্র প্রণব সরকার গুরুতর আহত হয়। সে আশাশু‌নি সদরের শংকর সরকারের ছেলে। সম্প্রতি সড়কের মালির মোড়ের কাছে চলন্ত মোটরসাইকেলের ওপর ডাল ভেঙে পড়ায় মারাত্মক আহত হন সদর উপজেলার বা‌লিথা গ্রামের আরশাদ আলী ওরফে ভোলা। তার কোমরের হাড় ভেঙে গেছে বলে জানায় পরিবার। গত কোরবানি ঈদের দিন মোটরসাইকেলে করে যাওয়ার পথে সড়কের মেল্লেকবাড়ী মোড়ের কাছে ডাল ভেঙে গুরুতর আহত হন মোটরসাইকেল আরোহী ফারুক হোসেন।
আশাশু‌নির জাহানাবাজ এলাকার বাসিন্দা আকতার হোসেন, সিরাজুল ইসলাম ও গোপাল চন্দ্র মণ্ডল গতকাল জানান, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মরা রেইনট্রি গাছের কারণে তাদের ছেলে-মেয়েরা নিরাপদে স্কুল-কলেজে যেতে পারে না। এসব মরা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে যেকোনো সময় পথচারীদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
তারা আরো জানান, বৃষ্টিপাত কমেছে। পানির অভাবে কয়েক বছর আগে রেইনট্রি গাছগুলো মরেছে। এখন এসব গাছের ডাল ভেঙে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সাবেক সাতক্ষীরা ‌জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ জানান, সড়কটির দুই পাশে অসংখ্য মরা রেইনট্রি গাছ এখন যাত্রীবাহী যান চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘‌প্রায়ই শুকনা গাছের ডাল ভেঙে পড়ে যাত্রীবাহী বাসের ওপর। এতে করে যাত্রীসহ বাস চলাচলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কটি।’ তিনি দ্রুত এসব মরা রেইনট্রি গাছ অপসারণ করে সড়কটি নিরাপদ রাখতে জেলা পরিষদসহ সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানান।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘‌এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। জনবহুল ও ব্যস্ততম একটি সড়কে সহস্রাধিক মরা রেইনট্রি গাছ দীর্ঘদিনেও অপসারণ হয়নি। দায়িত্বে এত অবহেলা কেন? এ সড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে।’ তিনি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সব মরা গাছ অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব মরা গাছ অপসারণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘এসব গাছের আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করার জন্য ‌সামাজিক বন বিভাগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করার পর দরপত্র আহ্বান করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সামাজিক বন বিভাগ সাতক্ষীরা জেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিএম মারুফ বিল্লাহ বলেন, ‘‌সাতক্ষীরা-আশাশুনি সড়কের পাশে যেসব গাছ আছে তার মালিক জেলা পরিষদ। তবে মরা গাছের মূল্য নির্ধারণ করে এক বছর আগে সাতক্ষীরা জেলা পরিষদকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তার পরও কেন তারা গাছ অপসারণের জন্য দরপত্র আহ্বান বা অন্য কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করেনি তা বলতে পারব না।’
প্রতিনিয়ত বদলে বদলাচ্ছে আবহাওয়া ও পরিবেশ। ফলে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মানুষের যাপিত জীবন ও অর্থনৈতিক খাতগুলোয়। এতে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট বিভিন্নভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। সংকটে রয়েছে উপকূলবাসীর জীবন।
নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, বাস্তুহারা হচ্ছে মানুষ, উৎপাদন কমছে কৃষিতে, মারা যাচ্ছে পুকুর-ঘেরের মাছ। এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর হওয়ায় হুমকিতে পড়েছেন কৃষিজীবী মানুষ। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সুন্দরবন, উপকূল সুরক্ষা, সুপেয় পানি, জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য জলবায়ুসহিষ্ণু ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে বাগেরহাটের বিভিন্ন সংগঠন।
জার্মান ওয়াচ গ্লোবালের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিআরআই-২০২১) অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি। ঝুঁকি ও ক্ষতিগ্রস্তের বিবেচনায় দেশের অবস্থান সপ্তম।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তালিকায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল রয়েছে। এ রকম অকস্মাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের প্রায় ৮ শতাংশেরও বেশি নি¤œাঞ্চল ও প্লাবনভূমি আংশিক অথবা স্থায়ীভাবে জলমগ্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের বিশ্লেষণ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অরক্ষিত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মানুষিক।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় চিংড়ি মৌসুমের শুরুতেই প্রচ- দাবদাহ, হঠাৎ বৃষ্টি ও ভাইরাসে আশঙ্কাজনক হারে মারা গেছে সাদাসোনা খ্যাত বাগদা চিংড়ি। উৎপাদন মৌসুমের শুরুতে ঘেরের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ চিংড়ি মারা যাওয়ায় অধিকাংশ চাষি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই মৌসুমে চিংড়িতে অন্তত ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা।
সাবেক ‌রামপাল উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন চিংড়ি চাষে বিপর্যয় ঘটার অন্যতম কারণ। বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর লবণসহিষ্ণুর উপযুক্ত মাত্রা ১৫ থেকে ২০ পার্টস পার থাউজেন্ড (পিপিটি)। জলবায়ুগত কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, লবণাক্ততা কমে যাচ্ছে। ঘেরের পানির তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। লবণাক্ততা কমে বেশির ভাগ ঘেরে ৫ থেকে ৭ পিপিটি, কোনো কোনো সময় এ মাত্রা ২ থেকে ৩ পিপিটিতে নেমে যাচ্ছে।
বাগেরহাট সদর উপজেলার মাছচাষি ও ব্যবসায়ী আব্দুল হক মোড়ল বলেন, ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে মাছ চাষ করি। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে আয় ততই কমছে। ২০০৫ সালের পর থেকে হোয়াইট স্পট ভাইরাস, ইয়োলো হেড, ব্যাকটেরিয়াজনিত কালো দাগ রোগে চিংড়ি আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা সাধারণ চাষিরা এর কারণ বের করতে পারিনি। মাটির উর্বরতাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম জানান, চিংড়ির ভাইরাস রোধে সরাসরি কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি ঘের প্রস্তুত ও মানসম্মত পোনা মজুত নিশ্চিত করতে পারলে ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের কার্তিকদিয়া পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মেহেরুন বেগম। তার স্বামী-সন্তান নেই। গত কয়েক বছরে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদ তিনবার কেড়ে নিয়েছে তার বসতবাড়ি। আবার ভাঙতে ভাঙতে চলে এসেছে ঘরের কোণে। একচিলতে ঘরটি ছাড়া তার কোনো সম্বল নেই, যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মান্নানের তিন বিঘা জমি রয়েছে। আগে এসব জমি থেকে বছরে ধানে খোরাকি হয়ে যেত। কিন্তু এখন লোনা পানি আগের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় চাষ করতে পারছেন না ধান।
তিনি বলেন, মার্চ-এপ্রিল মাসে লোনা পানির প্রভাব বেশি থাকে৷ এতে ধানের বীজতলা ও বেড়ে ওঠা ধান নষ্ট হয়ে যায়। অন্য কোনো রবিশষ্যও চাষ করা সম্ভব হয় না তার পক্ষে।
এদিকে জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ়ে পা দিলেও বাগেরহাটের মোংলায় নেই বৃষ্টির দেখা। প্রায় দুই মাস ধরে অনাবৃষ্টি ও দাবদাহে  শুকিয়ে গেছে জনপদের সব পুকুর ও ডোবা। দেখা দিয়েছে সুপেয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত পানির তীব্র সংকট। অনাবৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে গত ১৫ জুন মোংলা উপজেলা ইমাম পরিষদের আয়োজনে ইসতিসকার নামাজ (বৃষ্টি প্রার্থনা) আদায় করেছেন মুসল্লিরা। আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য বিশেষ দোয়া চেয়ে কান্নাকাটি করেন হাজারো মুসল্লি।
বারুইখালী গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, গরম এলেই তীব্র পানির সংকটে ভুগি আমরা। প্রচ- গরমের কারণে পুকুরের পানি শুকিয়ে গেছে। আশপাশের খালে লবণাক্ত পানি। বাধ্য হয়ে এ পানিতে গোসল রান্না ও খাওয়ার কাজে ব্যবহার করতে হয়।
মাংলার চাঁদপাই ইউনিয়নের মালগাজী গ্রামের একটি পুকুরের ওপর প্রায় তিন মাস (মার্চ-মে) নির্ভরশীল থাকতে হয় সহস্রাধিক পরিবারকে। কিন্তু প্রচ- তাপে এ বছর বেশির ভাগ পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ও লবণাক্ত হয়ে পড়ায় পুকুরটি জুন মাসেও কাজে আসেনি সাধারণ মানুষের। বাধ্য হয়ে দূরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি আনেন স্থানীয়রা। ক্ষেত্রবিশেষে পাড়ি দিতে হয় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ। জানাচ্ছিলেন গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হায়াত মজুমদার।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাগেরহাট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শুধু শরণখোলা উপজেলাতেই ৫৪৭টি পুকুরে স্থাপন করা পিএসএফের মধ্যে ৩৮৬টি অকেজো। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে স্থাপন করা অগভীর নলকূপের বেশির ভাগই নষ্ট। একই চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য উপজেলায়ও। সুপেয় পানির স্তর নেমে যাওয়াতেই এই সমসা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে জেলায় ঠিক কী পরিমাণ পিএসএফ-নলকূপ অকেজো রয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেনি দপ্তরটি।
উপকূলবাসীর পানি সংকট নিরসনে কয়েক বছরে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও সংকট মিটছে না। চলতি অর্থবছরে পাঁচটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৩২৭টি গভীর নলকূপ ও ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫১৩টি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং স্থাপন করা হয়েছে। আগের বছরগুলোয়ও প্রায় সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে জেলার পানি-সংকট নিরসনে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘন ঘন দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে উপকূলে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক জানান, বাগেরহাটে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয় সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি, জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া সুপেয় পানির সংকট নিরসনে গভীর নলকূপ স্থাপন, পুকুর খনন, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং স্থাপন করা হয়েছে।
উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ান হাসান এই প্রতিবেদককে বলেন ‌টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতকরণের জন্য অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও নানা পরিকল্পনা রয়েছে সরকারে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি বাগেরহাটের রামপালে স্থানীয়দের সুবিধার্থে লোনা পানি থেকে সুপেয় পানি উৎপাদনকারী ‘লবণাক্ততা দূরীকরণ (আরও) প্ল্যান্ট’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে। এ প্ল্যান্ট থেকে প্রতি ঘণ্টায় দেড় হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদিত হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাসে উপকূল নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বেশ কিছু দাবির কথা বলছে।
সাতক্ষীরা উপকূলের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধের পাশে ঝুপড়ি ঘরে থাকেন সখিনা খাতুন। ১৬ বছর আগে স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। এখন স্থানীয় কাঁকড়া খামারে তিন হাজার টাকা বেতনে কাজ করে সংসার চালান ৪৬ বছরের এই নারী। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিধ্বস্ত হয়েছিল তার ঘর। স্থানীয় এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘরটি পুনরায় নির্মাণ করেন। ঋণ শোধ হওয়ার আগেই পরের বছর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘর। আবারও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘর করেন। গত জুলাই মাসে খোলপেটুয়া নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘর। ভাঙা-গড়ার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম যেন তার নিত্যসঙ্গী। জীবনের গ্লানি টানতে টানতে এখন ক্লান্ত তিনি। অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করছেন।
ভাঙা-গড়ার নিয়তিতে পড়েছেন সখিনার মা আলেয়া বেগমও। তার ঘরটি ভেঙেছে পাঁচবার। প্রতিবারই ঋণ নিয়ে ঘর করেছেন। এভাবে ঘর নির্মাণ করতে করতে তারা এখন নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত।
শুধু সখিনা কিংবা তার মা আলেয়া বেগম নন; প্রতি বছর নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন শ্যামনগর ও আশাশুনি উপকূলের বাসিন্দারা। দিনদিন বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। সহায়-সম্পদ হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা। নেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এভাবে ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে উপকূলে। এতে সহায়-সম্পদ হারানোর পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসার অভাব, নারী-শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। উপকূলের এমন অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, উপকূলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকায় কাজ না থাকায় বাড়িতে নারীদের রেখে কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন পুরুষরা। তখন পরিবারের নারী-শিশুরা নানা নির্যাতন ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জীবনের গ্লানি টানতে টানতে এখন ক্লান্ত সখিনা। অনেকটা উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন করে।
সখিনা খাতুন বলেন, ‘এ বছর বড় ধরনের ঝড় আসেনি। সেজন্য ঘরটি টিকে আছে। কিন্তু ঘরের কিছু অংশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গায় পড়ায় সরিয়ে নিতে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। না হলে ভেঙে দেবে বলে নোটিশ দিয়েছে। ঘর সরাতে অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু টাকা পাবো কোথায়?’
বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দুর্গবাঢী এলাকার সদানন্দ মন্ডল বলেন, ‘আমাদের কষ্টের শেষ নেই। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমার ঘর অনেকবার ভেঙেছে। ২০১৯ সালে ফণীতে বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। স্থানীয় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আবারও ঘর তুলি। বছর না ঘুরতেই আম্পানের আঘাতে ভেঙে যায়। আবার ঋণ নিয়ে ঘর করলে পরের বছর ইয়াসে লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এরপর আমার মামা এলাকা ছেড়ে চলে যান। তার ঘরটি আমাকে দিয়ে যান। গত জুলাই মাসে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরটি। দুর্যোগে বারবার ঘর ভাঙে, বারবার ঋণ নিয়ে ঘর করি। ভ্যান চালিয়ে ঋণ শোধ করি। এভাবে জীবন চলে না। মন চায় অন্য জায়গায় চলে যাই। কিন্তু যাওয়ার জায়গা নেই।’
প্রতাপনগরের হাওলদারবাড়ি এলাকার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আম্পানে আমাদের ঘরবাড়ি চলে গেছে নদীতে। শুধু আমার নয়, এলাকার অনেকের ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজন কারও ঘর নেই। আমার বড়ভাই খুলনায় চলে গেছেন। আমি এখন শ্বশুরবাড়িতে থাকি। কখন এই ঘর ভেঙে যায় সে আতঙ্কে আছি।’
দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার মিজানুর রহমান বলেন, ‘খরা, ঝড়, বৃষ্টি ও নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আইলার পর থেকে গোটা এলাকা উদ্ভিদশূন্য। লবণাক্ততার কারণে সব গাছ মারা গেছে। এলাকায় বসবাস করা খুবই কষ্টের। বাঁধের অবস্থা নাজুক। বেড়িবাঁধ হলে পানি প্রবেশ করতো না। বাঁধ না থাকায় প্রতিবছর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। পুরো বছর সুপেয় পানির অভাবে থাকতে হয়। খুব খারাপ অবস্থায় আছি আমরা।’
প্রতাপনগরের স্বেচ্ছাসেবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর দুর্যোগে এলাকার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কোথায় গেছেন জানি না। এলাকায় কাজ নেই। সুপেয় পানির সংকট। ফলে মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয়দের কাছে শুনেছি, এলাকার অনেকে খুলনা, নড়াইল ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। যারা আছেন তারা খুব কষ্টের মধ্যে দিন পার করছেন।’
সহায়-সম্পদ হারিয়ে এখন দিশেহারা উপকূলের বাসিন্দারা
প্রতাপনগরের বাসিন্দা ও গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুস সবুর বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর দুই বছর ধরে পুরো ইউনিয়নের প্রতিটি বাড়িতে জোয়ার-ভাটা চলছিল। জোয়ার-ভাটার কারণে অনেকের বাড়ি খালে বিলীন হয়ে গেছে। সেসব মানুষ কোথায় চলে গেছেন জানি না, তারা আর ফেরেননি।’
তিনি বলেন, ‘সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে পুরো ইউনিয়নের মানুষ। লবণাক্ত পানিতে বসবাস করার ফলে চর্মরোগ, কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগ লেগেই আছে। লবণাক্ত পানির জন্য নারীদের অকাল গর্ভপাত ঘটছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT