
চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ২৮৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ২২৩টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (১৩০) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৪৬ শতাংশ। এ ছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৫০টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ৩৮টি, খেলাধুলা বিষয়ে ৩টি, শিক্ষা বিষয়ে ২টি, ধর্মীয় বিষয়ে ৫১টি, বিনোদন বিষয়ে ৯টি, প্রতারণা বিষয়ে ১টি এবং অন্যান্য বিষয়ে ১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে গত মাসে।
এসব ঘটনায় ভিডিও কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৪০টি। এ ছাড়া, তথ্য কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১০৯টি, ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৩৪টি এবং অডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ২টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ২০৬টি, বিকৃত ২২টি এবং বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৫৭টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ২৪২টি। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রামে ৩৩টি, ইউটিউবে ২০টি, এক্সে ৩৯টি, টিকটকে ২৯টি, থ্রেডসে ৩টি ও টেলিগ্রামে অন্তত ১টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ২৮টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। ৪টি ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতেও বাংলাদেশকে নিয়ে অপতথ্য প্রচার করতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গত কয়েক বছর ধরে বেশ আলোচনায় রয়েছে। দুর্গাপূজার কারণে গত মাসে এই ধরনের অপতথ্যের সংখ্যা আরও বেড়েছে। অক্টোবরে ৫২টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ২৮টি অপতথ্যই ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিএনপি সরকারকে জড়িয়ে গত মাসে ২৬টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যার সবগুলোতেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ১০টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় সবগুলোতেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অক্টোবর মাসে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ে ৯টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (৪টি, সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) শিকার হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রিউমর স্ক্যানার অক্টোবর মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৯টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ১৭টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় সবগুলোতেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এ ছাড়া, ছাত্রদল জড়িয়ে ৩টি ও যুবদলকে জড়িয়ে ১টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে অক্টোবর মাসে ২৬টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১০টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৫টি অপতথ্য (শতভাগ নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ২টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
অক্টোবর মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ১৬টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে ৫টি অপতথ্য (৮০ শতাংশ নেতিবাচক) প্রচার হতে দেখা যায়। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে ১টি অপতথ্য (নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে অক্টোবর মাসে ৪৩টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ১৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৯৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়েও এই সময়ে ১৭টি অপতথ্য (শতভাগ ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।
অক্টোবর মাসে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে ৪টিসহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে ১৫টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
অক্টোবর মাসে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ৩৮টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ২টি। সার্কাজম পেজের কনটেন্ট বাস্তব দাবিতে ছড়িয়েছে ৩২টি।
অক্টোবর মাসে দেশে অন্তত ৭টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে দুর্গাপূজা ইস্যুতে ৪৪টি, ভারতে আন্দোলন ইস্যুতে ১৬টি, সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ইস্যুতে ১০টি, সাজেকে সংঘাত ইস্যুতে ১০টি, মাদরাসায় যৌন নিপীড়ন ইস্যুতে ৯টি ও জাতিসংঘ অধিবেশন ইস্যুতে ৭টি ভুল তথ্যের প্রচার ছিল।
গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ হ্রাস পেতে দেখা যাচ্ছে। অক্টোবর মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ২৭টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ১৩টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ২৭টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
Leave a Reply