শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
শরণখোলায় জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত জিয়াউর রহমান জাতির নির্ভরতার মহান কাণ্ডারী ছিলেন: ইউএনও আলী সুজা খুলনায় রবীন্দ্রনাথের ছবি পুনরায় আঁকার উদ্যোগ কেসিসি প্রশাসকের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রাম পুলিশকে আরও সক্রিয় দেখতে চান প্রধানমন্ত্রী ইয়েমেনের বাজারে বিমান হামলায়, নিহত অন্তত ৩০ জামালপুরে ট্রাকচাপায় নিহত বেড়ে ৪, একই পরিবারের ৩ জন গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়িয়েছে সরকার, দেবে মাসিক মোবাইল খরচও তিশা-অথৈ’র বিরুদ্ধে অভিনয় শিল্পী সংঘের কঠোর সিদ্ধান্ত ‘ওয়ান ম্যান শো’, তৃতীয় টেস্টেই মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরি হৃদয়ের ইরানের পরমাণু প্রকল্পের তথ্য দিলে ২ কোটি ডলার পুরস্কার দেবে যুক্তরাষ্ট্র

ঋণের শেকলে দুবলার চরে ১০ হাজার জেলের জীবনযুদ্ধ

  • প্রকাশিত সময় : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ পড়েছেন
মোংলা প্রতিনিধি : উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউ আর উপকূলের বুক চিরে বয়ে চলা অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করতে আবারও সুন্দরবনের দুবলার চরের দিকে পা বাড়িয়েছেন হাজারো জেলে ও মহাজন। একদিকে বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের ভয়াবহ আতঙ্ক, অন্যদিকে গত মৌসুমের বড় ধরনের লোকসান আর মাথায় পাহাড়সম ঋণের বোঝা—এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জীবন ও জীবিকার টানে থেমে নেই তাঁদের এই যাত্রা। নতুন মৌসুমে সাগরে পর্যাপ্ত মাছ মিলবে এবং তা বিক্রি করে পুরোনো দেনার কিছুটা শোধ করা যাবে—এমন ক্ষীণ আশার আলো নিয়েই আবার সাগরে নামছেন তাঁরা।
​সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের অধীন দুবলার চরের আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া এবং শ্যালারচরে গড়ে উঠেছে এবারের অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী। প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলা এই শুঁটকি আহরণ মৌসুম ঘিরে গত শুক্রবার থেকেই শুরু হয়েছে পাঁচ মাসের এই কর্মযজ্ঞ। দেশের মোট শুঁটকি চাহিদার সিংহভাগই জোগান আসে এই অঞ্চল থেকে। কোরাল, লাক্ষ্যা, রূপচাঁদা, লইট্যা, ছুরি ও চিংড়ির মতো সুস্বাদু সামুদ্রিক মাছ রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয় এই পল্লীগুলোতে, যা পরবর্তীতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন বাজারে পৌঁছায়।
​তবে বিগত মৌসুমটি ব্যবসায়ীদের জন্য ছিল অত্যন্ত দুঃস্বপ্নের মতো। বৈরী আবহাওয়া ও সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি দস্যুদের লাগামহীন চাঁদার দাবিতে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকে।
আলোরকোল পল্লীর মহাজন জাকির শেখ জানান, গতবার তাঁকে একাই তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে এবং সব মিলিয়ে লোকসান গুনেছেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তাঁকে এবার ৪০ লাখ টাকার নতুন ঋণ নিতে হয়েছে। একই দুরবস্থার কথা জানালেন মোশারফ শেখ, মোনায়েম আলী, হাসিব শেখ এবং এনামুল হকের মতো বহু ব্যবসায়ী। লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেক মহাজন এখন চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ ঋণের ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়ানোর মতো পরিস্থিতিতেও পড়েছেন।
​ক্ষতির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে চাকলা মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রউফ মেম্বরের দেওয়া তথ্যে। গত মৌসুমে তাঁর নিজেরই বারো লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জেলের মজুরি ও বকেয়া মেটাতে তাঁকে শেষ পর্যন্ত এগারো কাঠা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। ব্র্যাক ও বিভিন্ন উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তিনিসহ বহু ব্যবসায়ী শেষবারের মতো ভাগ্য পরীক্ষার চেষ্টা করছেন। সমিতির আওতায় থাকা অন্তত ১৭ জন ব্যবসায়ী ঋণের চাপে জর্জরিত হয়ে ইতিমধ্যে তাঁদের ব্যবসা চিরতরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
জেলেদের ভাষ্যমতে, গত মৌসুমে প্রতিটি ট্রলার বা নৌকা প্রতি মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে বাধ্য করা হতো। যারা দিতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তাঁদের মাঝদরিয়া থেকে অপহরণ করে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হতো।
​দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, দুবলার শুঁটকি খাত কেবল কয়েকজন মহাজনের ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে অন্তত ১০ হাজার জেলের জীবন-জীবিকা। এছাড়া পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ, জাল ও নৌকা মেরামতের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন হাজারো মানুষ। দস্যুদের এই দৌরাত্ম্য এখনই শক্ত হাতে দমন করা না হলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
​বন বিভাগ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কিছুটা কমে পাঁচ হাজার চারশ মেট্রিক টনে নেমেছিল, যেখান থেকে সরকারের প্রায় সাত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হয়েছিল। চলতি মৌসুমে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে সাত কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জেলেদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
​মৎস্যজীবীদের এই গভীর শঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে এবার কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুবলার চর, আলোরকোল ও আশপাশের নদী ও চ্যানেলে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণ প্রতিরোধে কোস্ট গার্ডের জাহাজ ও বিশেষ দল মাঠে রয়েছে। পাশাপাশি জরুরি সহায়তার জন্য ১৬১১১ নম্বরে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বন বিভাগও জানিয়েছে, জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে তাঁদের পেশা পরিচালনা করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে।
​চরের বুকে এখন ঘর বাঁধার ব্যস্ততা, জাল ঠিক করার টুংটাং শব্দ আর নৌকা সাগরে ভাসানোর প্রস্তুতি। কিন্তু এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে প্রতিটি জেলের মনে কাজ করছে এক অদৃশ্য ভয়। উৎপাদনে যাওয়ার আগে তাঁদের একমাত্র প্রার্থনা—প্রশাসন যেন কেবল খাতার অঙ্কে নয়, বাস্তবেই সাগরে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে দেয়, যা তাঁদের পুরোনো ঋণের জাল ছিঁড়ে নতুন আলোর মুখ দেখাতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত -২০২৫, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রযুক্তি সহযোগীতায় BD IT SUPPORT