বিশেষ প্রতিনিধি : ভালো নেই সুন্দরবন রক্ষা করবে কে?।।সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এবং দেশের পার্বত্য অঞ্চলের বনভূমির আয়তন ও পরিমাণ কমছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর ৩৫০টি ফুটবল মাঠের সমান বনভূমি বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন থেকে কমে যাচ্ছে। আয়তন কমে আসায় সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কমে আসছে গাছ, লতাগুল্ম, মাছসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। এই বৈরি পরিস্থিতির মধ্যে সুন্দরবন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বহু বছর ধরে সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকির কথা বলা হলেও কার্যত: এর রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। স্বাদু ও লোনাপানি মিলিত হয়, এমন ভূমিতে সুন্দরবন গড়ে উঠেছে। বনবিজ্ঞানীরা এ ধরনের বনের নাম দিয়েছেন ম্যানগ্রোভ। বিশ্বের আরও বেশ কিছু সমুদ্র উপকূলে ম্যানগ্রোভ রয়েছে। তবে সুন্দরবনের মতো এত বড় ম্যানগ্রোভ বন বিশ্বের আর কোথাও নেই।
তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর খুলনা (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) জেলার গেজেটিয়ার লেখার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। ১৯৭৮ সালে ছাপা ওই গেজেটিয়ারে বলা হয়েছিল, নির্বিচার বনসম্পদ লুট ও প্রাণী হত্যা বন্ধ না হলে সুন্দরবন বিবর্ণ, বৃক্ষলতাহীন, প্রাণহীন হয়ে পড়বে। পাঁচ দশক পর পরিস্থিতি ততটা মারাত্মক না হলেও সুন্দরবনের প্রাণপ্রাচুর্য কমছে। গবেষকেরা বলছেন, সুন্দরবনের কিছু গাছ, প্রাণী ও পাখি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গোপসাগর উপকূলের বড় অংশজুড়ে সুন্দরবন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে, বাকি ৪০ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে গাছ, লতাগুল্ম, পাখি, প্রাণী, মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা বেশি।
২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে সুন্দরবনের আয়তন কমে আসার তথ্য প্রকাশ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুন্দরবন ও বনসংলগ্ন এলাকার মানুষের টিকে থাকার বিষয় নিয়ে এ প্রতিবেদন করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯০৪-১৯২৪ সালে দুই দেশের সুন্দরবনের আয়তন ছিল ১১ হাজার ৯০৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৭ সালে তা কমে হয় ১১ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। ২০০১ সালে আয়তন কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫০৬ বর্গকিলোমিটারে। ২০১৫-১৬ সালে আয়তন ছিল ১১ হাজার ৪৫৩ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ গত ১০০ বছরে সুন্দরবনের আয়তন ৪৫১ বর্গকিলোমিটার কমে গেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন কমে যাওয়ার পৃথক কোনো পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি। তবে ওই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯০৪-১৯২৪ সালে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন ছিল ৭ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫-১৬ সালে আয়তন কমে ৬ হাজার ৮৭১ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১০০ বছরে সুন্দরবনের ২৫২ বর্গকিলোমিটার হারিয়ে গেছে। এর হিসেবে প্রতিবছর আড়াই বর্গকিলোমিটারের মতো বন হারিয়ে যাচ্ছে। এ পরিমাণ জমির আয়তন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার ৩৫০টি ফুটবল মাঠের সমান।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা সংস্থা সিজিআইএসের গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের আয়তন কমছে, জলাভূমি বাড়ছে। বনাঞ্চলে ঘুরে এবং উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণায় বলা হয়েছে, ২৭ বছরে ৭৬ বর্গকিলোমিটার জমি কমেছে সুন্দরবনের। তবে বনের জমি কমে আসার বিষয়টি স্বীকার করতে চায় না বন বিভাগ। ভূতত্ত্ববিদেরা বলছেন, দেশের কিছু এলাকাসহ সুন্দরবন হচ্ছে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ‘অ্যাকটিভ ডেলটা’ অঞ্চলে। অর্থাৎ এই বদ্বীপ এলাকায় ভূগঠনপ্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এই অঞ্চলের ভূমি এখনো ভাঙা-গড়ার মধ্যে রয়েছে। সুন্দরবনের মধ্যে ছোট-বড় অসংখ্য নদী ও খাল রয়েছে। জালের মতো বিছানো এসব খাল-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার। এসব নদী-খাল দিনে দুবার জোয়ারের পানিতে ভরে ওঠে, দুবার ভাটায় পানি নেমে যায়। জোয়ার-ভাটার কারণে নদীর পাড় ভাঙে-গড়ে। তবে বিগত ১০০ বছরে ভাঙনই বেশি লক্ষ্য করা গেছে। নদীভাঙনের কারণে বনের জমি কমছে এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার।
শুধু আয়তনের কারণে নয়, জীববৈচিত্র্যের জন্যও সুন্দরবন অনন্য। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বনে ৫২৮ প্রজাতির বৃক্ষ ও লতাগুল্ম আছে, আছে ৩০০ প্রজাতির পাখি। ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির স্তণ্যপায়ী এবং ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণী সুন্দরবনে চরে বেড়ায়। সুন্দরবনের নদী-খালে ২৫০ প্রজাতির মাছ আছে। আছে বহু প্রজাতির কীটপতঙ্গ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক। আছে নানা ধরনের ছত্রাক, শেওলা। কিন্তু চার দশক ধরে সুন্দরবনে উত্তর থেকে আসা স্বাদুপানির পরিমাণ কমেছে, লোনাপানির প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে লোনাপানিসহিষ্ণু গাছ ও লতাগুল্মের প্রজাতি টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে। কমেছে বা ঝুঁকিতে পড়েছে স্বাদুপানি বা ব্রাকিস সহিষ্ণু প্রজাতিগুলো। সাম্প্রতিককালে বেশি আলোচনা হচ্ছে রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া কয়লার ছাই সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে পরিবেশবাদীরা কয়েক বছর ধরে অভিযোগ করে আসছেন। এছাড়া মোংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় ১০০ শিল্পকারখানা। এসব কারখানার বর্জ্য পশুর নদ হয়ে সুন্দরবনে পৌঁছায়। বড় বড় জাহাজ ছাড়াও অসংখ্য নৌযান নিয়মিত যাতায়াত করে পশুর নদ দিয়ে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজসহ সব নৌযান চলাচল করায় উচ্চ শব্দ বনের নিস্তব্ধতা ভাঙে। এছাড়া সুন্দরবনে আছে শিকারির উৎপাত। মাছ ধরার নামে জলজ প্রাণী নিধনও চলছে। জেলেরা ছোট ছোট খালে বিষ ঢেলে মাছ শিকার করে। এতে মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ প্রাণীও মরছে। মানুষের এসব কর্মকা- ছাড়াও সুন্দরবনে আঘাত হানে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে শুধু যে গাছের ক্ষতি হয় তা নয়, পশুপাখিরও প্রাণহানি ঘটে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, বছর বছর ঝড়-জলোচ্ছ্ব¡াসের সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্বব্যাংক বলছে, সুন্দরবন থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ ধরনের স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা মাছ ও গাছের প্রজাতির বর্ণনাও তাতে আছে। সস্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনে ঘন বন ছিল ৬৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে হয় ৩৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় যুক্ত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, শত শত বছর ধরে সুন্দরবন ঝড়ঝঞ্ঝা থেকে মানুষকে রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ও অর্থনীতিতে এর অবদান অপরিসীম। দেশে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট দেশের বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এর একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলো অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল বিশেষ করে মানুষের কার্যকলাপ এবং প্রাকৃতিক কিছু কারণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছিল।
এর মধ্যে বন উজাড় ম্যানগ্রোভ বনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঠ, জ্বালানি কাঠ এবং কৃষিজমির চাহিদা ব্যাপকভাবে ম্যানগ্রোভ গাছ কাটার দিকে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে। এ কারণে অসংখ্য প্রজাতি তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘিœত হয়েছে। ম্যানগ্রোভ বনকে চিংড়ির খামারে রূপান্তরিত করার ফলে বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ ও খাল নির্মাণ প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ধরণকেও ব্যাহত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ হয়ে উঠেছে। ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় গাছ উপড়ে এবং নোনা পানি অনুপ্রবেশসহ ম্যানগ্রোভ বনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ২০১৪ সালে তেলবাহী ট্যাংকার সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ডুবে গেলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সমগ্র সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: খান মাহাবুব হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: মিশারুল ইসলাম (মনির), বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২৬/১, ফারাজীপাড়া লেন, খুলনা। প্রকাশক কর্তৃক ফ্রেন্ডস প্রিন্টার্স, ১০৭, স্যার ইকবাল রোড থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বিজ্ঞাপন বিভাগ : ফোন : ০৪১-৭৩২৭০০, মোবা : ০১৭১১-৩৪৬৬৬২, ০১৭১১-০৬৫৭৫৬। 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥 : 𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, 𝐖𝐞𝐛 : 𝐰𝐰𝐰.daily𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧.𝐜𝐨𝐦
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত : dailysangjogprotidin.com