বিশেষ প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার অর্থনীতিতে বাগদা চিংড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং রপ্তানি পণ্যের মধ্যে এটি অন্যতম প্রধান। এর উচ্চ বাজারমূল্য ও রপ্তানি সক্ষমতার কারণে এটি স্থানীয়ভাবে “সাদা সোনা” নামে পরিচিত।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহ, ভাইরাস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই চিংড়ি চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও এটি সাতক্ষীরার একটি মূল্যবান ফসল। দেশের রপ্তানি আয়ে বাগদা চিংড়ি বড় অবদান রাখছে এবং সাতক্ষীরার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে।
সাতক্ষীরার আশাশুনি, কালীগঞ্জ, শ্যামনগর, দেবহাটা সহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাগদা চিংড়ির চাষ হয়। তবে বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তাপপ্রবাহ, এবং ভাইরাসের আক্রমণে চিংড়ি চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়াও, আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা চিংড়ির সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও, কোভিড-পরবর্তী সময়ে চিংড়ির দাম কমে যাওয়ায় চাষীরা বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। নদীর পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা বৃদ্ধিও চিংড়ি শিল্পের জন্য একটি বড়
এই সমস্যাগুলো থাকা সত্ত্বেও, সাতক্ষীরার বাগদা চিংড়ি আজও স্থানীয় অর্থনীতি ও বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয় চাষীদের মতে, বাগদা চিংড়ির পোনার (রেনু) দাম কম হলে এবং সরকারি সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ পেলে আরও অনেকে এই পেশায় যুক্ত হবেন, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও লাভবান করবে।
লোকসান বেড়েছে এ্যাপেক্স ট্যানারির শাহজিবাজার পাওয়ারের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ বড় হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি ১৩ বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেল আরাকান আর্মি কাল জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা গণভোটের চেয়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার তৈরি করা বেশি জরুরি: তারেক রহমান আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন চেম্বারে স্থগিত লোকসান থেকে লাভে ফিরল রানার অটোমোবাইলস সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের বাসায় অভিযান, আটক ৭ একমি ল্যাবরেটরিজের প্রথম প্রান্তিক প্রকাশ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার চিংড়ি চাষীদের দূর্ভোগ যেন কাটছে না। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মহামারি করোনায় চিংড়ি চাষীরা সর্বশান্ত হওয়ার পথে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে নদী ভাঙন আর অতি বৃষ্টিতে মাছের ঘের প্লাবিত হওয়ায় সাতক্ষীরার চাষীদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। তার উপর মহামারি করোনায় বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ থাকায় দেশের বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরায় মাছের ক্ষতি হয় ১৭৬ কোটি টাকা। এরপর ২০২১ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে মাছের ক্ষতি হয় ১৬ কোটি টাকা। সবশেষ গত ২৭ জুলাই অতিবৃষ্টিতে ক্ষতি হয় ৫৩ কোটি টাকার মাছ।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর আরো জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় ঘূর্ণিঝড় আম্পানে। এ ঝড়ে ১০ হাজার ২৫৭ টি মাছের ঘের সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে করে ১৭৬ কোটি টাকার চিংড়ি ও সাদা মাছ নষ্ট হয়ে যায়।
প্রধানত চিংড়ি শিল্প থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয় বাংলাদেশের। করোনাকালে বিদেশে চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ থাকায় আয়ের সেই খাতটিও বন্ধ হয়ে যায়। এতে লোকসানের মুখে পড়ে চিংড়ি চাষীরা।
এদিকে, সাতক্ষীরা জেলায় ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেড় লাখ টনের বেশি রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। যার রপ্তানি মূল্য সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে করোনা মহামারী ও মানসম্মত না হওয়ায় গত দুই বছরে রপ্তানিযোগ্য এসব চিংড়ির বড় অংশই দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা।
অন্যদিকে, সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, পাঁচ বছরে জেলায় রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ১৪৬ টন। এর মধ্যে বাগদা চিংড়ি এক লাখ ১৮ হাজার ৩০৮ টন। গলদা চিংড়ির পরিমাণ ৩৩ হাজার ৮৩৭ টনের মতো। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৫ হাজার ৩৫৪ টন বাগদা ও ৬ হাজার ৩৪ টন গলদা চিংড়ি।
এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৪৮৫ টন বাগদা ও ৬ হাজার ১০৬ টন গলদা, ২০১৭-১৮ বাগদা ২০ হাজার ৯৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫২৫ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাগদা ২১ হাজার ৪৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫৪২ টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৮৭ টন বাগদা ও ৮ হাজার ৬৩০ টনের মতো চিংড়ি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত এসব চিংড়ির রপ্তানিমূল্য ৭ হাজার ৬০৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জেলায় বছরে প্রায় ৬০ হাজার নিবন্ধিত ঘেরে চিংড়ি চাষ করা হয়।
সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি চাষীদের থেকে জানা গেছে, তারা কেউ কেউ শত বিঘা জমিতে মাছের ঘের করেছিলেন। এসব ঘেরে উৎপাদিত চিংড়ি প্রতি বছর বিদেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু দুই বছর ধরে চিংড়ি রপ্তানি করতে পারছেন না। ফলে দেশের বাজারেই বিক্রি করতে হচ্ছে চিংড়ি। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মহামারি করোনা ছাড়াও চিংড়িতে ভাইরাস রোগের কারণে মড়ক লাগে। এতে চিংড়ি চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদিত চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা আরও সমন্বয় করা জরুরী বলেও তারা মনে করেন
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমান মনে করেন, রপ্তানিজাত চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ উৎপাদনে সাতক্ষীরা খুবই সম্ভাবনাময়। তিনি বলেন, এখানকার মাটি, পানি ও আবহাওয়া সব ধরণের মাছ চাষের উপযোগী। প্রতি বছর এ জেলায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার চিংড়ি অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি করা হয়। এছাড়া সাদা মাছও ব্যাপকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। এক লাখ টনের ওপরে সাদা মাছ উৎপাদন হয়, যা এ জেলার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। মাছ চাষের সঙ্গে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত।
পরিসংখ্যান ঘেটে জানা গেছে, আশির দশক থেকে মূলত সাতক্ষীরায় বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি উৎপাদন শুরু হয়। দেশের যে কয়টি জেলায় রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয় তার মধ্যে অন্যতম সাতক্ষীরা। প্রতি বছর সাতক্ষীরা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাগদা ও গলদা চিংড়ি রপ্তানি হয়। যা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় ভূমিকা রাখছে। তবে জেলার অনেক চাষী অপরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ করছেন। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদবলেন, যেকোনো মাছ উৎপাদনে সাতক্ষীরার সুনাম রয়েছে। সাতক্ষীরা খুবই সম্ভাবনাময় একটি জেলা। সাদা মাছের পাশাপাশি বছরে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি হয়। মাছ চাষীরা যাতে আগামীতে আরও বেশি উৎপাদন করতে পারেন সেজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে যারা প্রান্তিক পর্যায়ের মৎস্যচাষী তাদের সরকারের প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: খান মাহাবুব হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: মিশারুল ইসলাম (মনির), বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২৬/১, ফারাজীপাড়া লেন, খুলনা। প্রকাশক কর্তৃক ফ্রেন্ডস প্রিন্টার্স, ১০৭, স্যার ইকবাল রোড থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বিজ্ঞাপন বিভাগ : ফোন : ০৪১-৭৩২৭০০, মোবা : ০১৭১১-৩৪৬৬৬২, ০১৭১১-০৬৫৭৫৬। 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥 : 𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, 𝐖𝐞𝐛 : 𝐰𝐰𝐰.daily𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧.𝐜𝐨𝐦
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত : dailysangjogprotidin.com