সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : নয়নাভিরাম সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগরের তীর ধরে জেগে ওঠা এক সমুদ্র্রসৈকত মান্দারবাড়িয়া।
বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদ সুন্দরবনঘেঁষা উপজেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর। নয়নাভিরাম সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষে জেগে ওঠা এক সমুদ্রসৈকত মান্দারবাড়িয়া। যার একপাশে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন, অপর পাশে বঙ্গোপসাগরের অতল জলরাশির খেলা। প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়ায় বেড়ে ওঠা আট কিলোমিটার দীর্ঘ এ বেলাভূমি এখনো যেন অনেকটাই থেকে গেছে অনাবিষ্কৃত। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি, সরকারি প্রচার-প্রসারের উদ্যোগহীনতা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে দীর্ঘদিনেও সেভাবে জনসম্মুখে আসেনি দৃষ্টিনন্দন দীর্ঘ এ সমুদ্রসৈকতটি।
মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত একদিকে যেমন হয়ে উঠতে পারে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে অবহেলিত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যবদলের হাতিয়ার, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের পর্যটনশিল্পকে সমৃদ্ধ করার সব ধরনের উপকরণ বিদ্যমান অপরূপ সৌন্দর্যের এ লীলাভূমি। একইসঙ্গে বনভূমি এবং জলাভূমির সহাবস্থান যেন মান্দারবাড়িয়াকে দিয়েছে সৌন্দর্যের অনন্য এক উচ্চতা। যা সহজেই যে কোনো পর্যটককে বিমোহিত
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর ঘাট থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ কিলোমিটার। যাত্রাপথে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক দৃশ্য, আঁকাবাঁকা নদী, চির সবুজ গোলপাতা, কেওড়া, গেঁওয়া, গরান, সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রকারের গাছ, হরিণ, বানর, শূকর, কুমির, রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা প্রজাতির জীবজন্তু আর বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচির মিচির সুরেলা ডাক পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। সুন্দরবনের গা ছমছমে ভয়ংকর পরিবেশ যে কোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে দিতে পারে ভ্রমণের সর্বোচ্চ আনন্দ। দেখা যাবে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। সাগরের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি এবং জঙ্গলের গাছ-গাছালির সবুজ বেষ্টনী মিলেমিশে তৈরি করেছে যেন এক রূপকথার রাজ্য। যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তিই চাইবে হারিয়ে যেতে এমন এক রাজ্যে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মূল উপাদান এ দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। আর এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন এসব উপাদানকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। দেশের পর্যটন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মান্দারবাড়িয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় পর্যটন, পর্যটন বাজারের বৃহত্তম অংশ সারা বিশ্বের জিডিপির ৫ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের ৬/৭ শতাংশ। ১৫০টি দেশে এটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রথম পাঁচটি খাতের মধ্যে একটি, যা মান্দারবাড়িয়ার অপার সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত দেয়। যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মান্দারবাড়িয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিয়ে টেকসই পর্যটন সৃষ্টি করতে পারলে সেটি যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করতে সক্ষম হবে, একইভাবে দেশের অর্থনৈতিক খাতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে।
দেশের অন্যান্য উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো থেকে যে পরিমাণ আয় হয়, সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মান্দারবাড়িয়া থেকেও একই পরিমাণ আয় সম্ভব। এ ছাড়া উপকূল ঘিরে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ এবং পায়রা বন্দরের সঙ্গে সারসরি সংযোগ সড়ক সৃষ্টির মতো পরিকল্পনা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা অনেক বেশি সহজ করে তুলবে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম।
মান্দারবাড়িয়াকে টেকসই পর্যটনকেন্দ্র সৃষ্টির মাধ্যমে সারা বছর পানিবন্দি থাকা দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান ঊর্ধ্বগামী করা সম্ভব। প্রচুর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের বেকারত্ব দূরীকরণ করাও সম্ভব হবে। সৈকতভিত্তিক বিনোদন এবং পর্যটন, সমুদ্রের কাছে পর্যটন কার্যক্রম, ইয়টিং, মেরিনাসহ নটিক্যাল বোটিংয়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন মান্দারবাড়িয়ার প্রসার বাড়ানো সম্ভব, তেমনিভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুতগামী হবে। সৃষ্টি হবে ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজমের’। যা হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন সূচনা। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
সাতক্ষীরা পশ্চিম সুন্দরবন রেঞ দ্বিতীয় যুদ্ধের মাধ্যমে বালক সম্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর বৈরাম খানের অভিভাবকত্যে দিল্লী-আগ্রা পুনঃরুদ্ধার করে মুঘল সালতানাতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। এরপর সম্রাট আকবর গোয়লিয়া, আজমীর, জৌনপুর পুনরাধিকার করে মুঘল সালতানাতকে শক্ত ভীতের উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি চিতোর, রনথম্বোর, বিকানীর, কালিঞ্জর, চিতোর, মেবার ও গুজরাটের বিরুদ্ধে বিজয় অভিযান পরিচালনা করে সফল হন। গুজরাট জয়ের পর সম্রাট আকবরের নৌ শক্তি বৃদ্ধির সুযোগ ঘটে। এ সময় সম্রাট আকবর বাংলাদেশে তার প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হন। সেই সময়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শাসক শাসনকার্য পরিচালনা করিতেছিল। এর মধ্যে আফগান শাসক সুলেমান কররাণী বাংলা ও উড়িষ্য শাাসন করিতেছিলেন। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আফগান সমর্থনে বাংলার কিছু ভূইয়া বা জমিদার স্বাধীনভাবে তাদের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছিলো। বাংলার ওই সকল ভূইয়া বা জমিদারদের ইতিহাসে বারো ভূইয়া নামে পরিচিত। বারো ভূইয়ার এক ভূইয়া যশোরের জমিদার প্রতাপাদিত্য।
গত ১৮ ফেব্রয়ারী ২০১৭ শনিবার পাঁজিয়া ডিগ্রী কলেজ থেকে শিক্ষক-কর্মচারী মিলে দেখতে গেলাম প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ধূমঘাট। আমাদের গাইড হিসেবে ধূমঘাট গ্রামের আবুল কাসেম গাজীর পুত্র ইসমাইল হোসেনকে পেলাম। ইসমাইল পেশায় শিক্ষক। চমৎকার ছেলেটি। তার কাছ থেকে ধূমঘাট সম্পর্কে জানলাম সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ৮নং ইশ্বরীপুর ইঊনিয়নের একটি গ্রাম ধূমঘাট। এই গ্রামেই পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে যশোহরের জমিদার প্রতাপাদিত্য রাজধানী স্থাপন করেন। প্রবল প্রতাপ মুঘল বাদশাহ সম্রাট আকবরের প্রিয়পাত্র সেনাপতি টোডরমলের সুপারিশে বিক্রমাদিত্য ও তার ভ্রাতা বসন্ত রায় মুঘলদের অধীন সামান্তরাজ হিসেবে জমিদারি লাভ করেন। পরবর্তী কালে আগ্রায় গিয়ে পিতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে নিজে নামে জমিদারি সনদ লাভ করেন। এই প্রতাপাদিত্য ১৫৯৯ সালে মুঘল কর্তৃত্ব অস্বীকার করলে মুঘলরা তাকে দমনের জন্য যুদ্ধাভিজান পরিচালনা করেন। মুঘলদের প্রতিরোধের জন্য সুন্দরবন সংলগ্ন দুর্গম এলাকা ধূমঘাটে রাজধানী স্থাপন করে প্রতিরোধের চেষ্ঠা করেন। তার সকল চেষ্ঠা ব্যর্থতায় পর্যাবসিত হয়। প্রতাপাদিত্য বন্দী অবস্তায় আগ্রায় নেওয়ার পথে মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই হলো সারসংক্ষেপ। নিন্মে প্রতাপাদিত্যের উত্থান সম্পর্কে আলোচিত হলো।
গুজরাট বিজয়ের পর সম্রাট আকবর বাংলা বিজয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সম্রাট আকবরের যুদ্ধ নীতি ছিল আক্রমণের পূর্বে বশ্যতা স্বীকারের জন্য দূত প্রেরণ করতেন। কোন শাসক আকররের বশ্যতা স্বীকার করলে তিনি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করতেন না। তখন বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন আফগান শাসক সুলেমান খান কররাণী। সুলেমান কররাণী দুরদর্শী শাসক ছিলেন। তিনি মুঘলদের শক্তি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করে নির্বিঘ্নে রাজ্য শাসন করতেন। সুলেমান কররাণীর মৃত্যুর পর তার পুত্র দাউদ কররাণী শাসনভার গ্রহন করে মুঘল কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। গুজরাটে যুদ্ধাবস্থায় আকবরের ব্যস্ততার সুযোগে দাউদ কররাণী মুঘলদের পূর্ব সীমান্তবর্তী জামনিয়া দূর্গটি দখল করেন। এ কারণে ১৫৭৪ খৃষ্টাব্দে সম্রাট আকবর দাউদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান প্রেরণ করলে দাউদ পরাজিত হয়ে মুঘল বশ্যতা স্বীকার করেন। কিন্তু কয়েক মাস পরেই দাউদ পুনঃরায় বিদ্রোহ করলে মুঘল বাহিনী কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে অবশেষে রাজমহলের যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন।
মুঘল আক্রমণে পর্যদুস্ত দাউদ যখন বুঝতে পারেন তার সময় শেষ,তখন তাদেরই অন্নে প্রতিপালিত শ্রীহরি ওরপে বিক্রমাদিত্য ও জানকিবল্লব ওরপে বসন্তরায়ের হাতে কররাণী বংশের সকল ধনরত্ন আমানত সরুপ প্রদান করেন। প্রাপ্ত ধনরত্ন বিক্রমাদিত্য ও বসন্তরায় নৌপথে সংগোপনে তাদেরই প্রদানকৃত বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ভূভাগ যশোহর রাজ্যে নিয়ে আসেন। দাউদ ছাড়াও তার সভাসদগণ অনেকেই মুঘল বিদ্রেহের পরিনতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তারাও অনেকে তাদের সঞ্চিত সম্পদ বিক্রমাদিত্যকে প্রদান করে সেগুলো নির্বিঘ্নে যশোহর পৌছানোর জন্য সহায়তা করেছিলেন। দাউদের পতনের পর আফগানদের থেকে প্রাপ্ত বিপুল ধনরত্নের সহায়তায় উভয় ভ্রাতা রাজ্যে স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠেন। তারা অনুভব করে রাজ্যে স্থাপনের জন্য মুঘল আনুকল্য বিশেষ প্রয়োজন। তারা সুকৌশলে দাউদের পক্ষ ত্যাগ করে মুঘলদের সংগে আঁতাত করার পথ খুঁজতে থাকে। সুযোগও মিলে যায়। মুঘল রাজপুত সেনাপতি টোডরমলের সংগে সাক্ষাৎ করে তারা মুঘল আনুগত্য স্বীকার করেন এবং কররাণী শাসনামলের কিছু হিসাব-পত্রাদি প্রত্যর্পন করেন। সেনাপতি টোডরমলও তাদের প্রশ্রয়দাতা হয়ে মুঘলদের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। টোডরমলের অনুরোধে বিক্রাদিত্য মুঘল স¤্রাট আকবরের সামান্তরাজ বলে স্বীকৃতি লাভ করেন এবং যশোহর রাজ্যের সনদপ্রাপ্ত হন।
১৫৭৭ খৃষ্ঠাব্দে বিক্রমাদিত্য যশোরে ফেরত এসে মুঘল সামান্তরাজ হিসেবে যশোহর রাজ্যের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তার রাজ্যাভিষেক ধুমধামের সহিত পালিত হয়। গৌড় থেকে প্রাপ্ত অঢেল ধনরত্ন ও মুঘলদের সনদ প্রাপ্ত হয়ে যশোহর রাজ্য নিবিঘ্নে গড়ে উঠতে থাকে। শ্রীহরি গৌড়ে অবস্থানকালে গোপীনাথ নামে তার এক পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। বিক্রমাদিত্য ‘মহারাজ’ উপাধি লাভের পর গোপীনাথ যুবরাজ প্রতাপাদিত্য নামে পরিচিত হন। জন্মের মাত্র পঞ্চম দিনে সুতিকাগারে তার মা মারা যায়। প্রতাপের জন্মকোষ্ঠীতে পিতৃহন্তা দোষ ছিল। পত্নীর বিয়োগ ও কোষ্ঠীতে পিতৃহন্তা দোষ থাকার কারণে আতুড়ঘর থেকেই বিক্রমাদিত্য সন্তানের প্রতি নাখোশ ছিলেন। সুতিকাগার থেকে খুল্লতাত জানকিবল্লভ ও তার জেষ্ঠা পত্নীর অপথ্য ¯্নেেহ ও ভালবাসায় গোপীনাথ প্রতিপালিত হতে থাকেন।
১৫৭৮ খৃষ্টাব্দের শেষ ভাগে যুবরাজ প্রতাপাদিত্য আগ্রায় গিয়ে তিন বছর সেখানে অবস্থান করেন। ১৫৮০ খৃস্টাব্দে বঙ্গ-বিহারে জায়গীরদারদের বিদ্রোহ দেখা দিলে স¤্রাট আকবর সেনাপতি টোডরমলকে বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রেরণ করেন। টোডরমল সফলতার সাথে সেই বিদ্রোহ দমন করেন। ওই সময় যশোহর রাজ্য সেই বিদ্রোহে যোগ দেয়নি। তিন বছর আগ্রায় অবস্থান কালে যুবরাজ প্রতাপাদিত্য নিজে যশোহর রাজ্যের কর্তৃত্ব লাভের চেষ্ঠা করেন। তখন যশোহর রাজ্য থেকে বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় কর্তৃক প্রেরিত রাজকর মুঘল সম্রাটের খাজাঞ্চি খানায় জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন এবং সুবিধামত সময়ে সম্রাটকে পিতার বিরুদ্ধে রাজকর পরিশোধের অনিহার কথা জানান। পাশাপাশি সম্রাটকে আশ্বস্ত করেন তার নামে যশোহরের সামান্ত রাজার সনদ দিলে তিনি রাজকর পরিশোধ করবেন। এছাড়াও চিরদিন তিনি মুঘল সম্রাটের অনুগত থাকবেন। সম্রাট আকবর প্রতাপের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে প্রতাপের নামে যশোহর রাজ্যের সনদ দিলে আত্মসাৎকৃত অর্থ থেকে রাজকর পরিশোধ করেন। সম্রাট আকবর তাকে যানবাহন ও সৈন্যসামান্ত দিয়ে যশোহর রাজ্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ১৫৮২ খৃষ্ঠাব্দে প্রতাপাদিত্য মুঘল সম্রাটের বলে বলিয়ান হয়ে যশোহর রাজ্যে পৌছান এবং পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন ও যশোহর দূর্গ অবরোধ করেন।
প্রতাপাদিত্যের আচারণে রাজপরিবারের সকলেই হতবাক হন। বসন্তরায়ের পরামর্শক্রমে সকলে খুশি হওয়ার অভিনয় করে। যুবরাজ প্রতাপাদিত্য তখন থেকে রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়ে হয়ে ওঠেন। বিক্রমাদিত্য নামে মাত্র রাজা। সকল ক্ষমতা প্রতাপের। পুত্রের শঠতা, বিশ্বাসঘাতকতা , ক্ষমতালিষ্পা বিক্রমাদিত্যকে দারুনভাবে আহত করে। এই ঘটনার মাত্র এক বছর পর ১৫৮৩ সালের শেষভাগে তিনি দেহত্যাগ করেন। সাড়ম্বরে যশোহরের রাজধানীতে তার শ্রাদ্ধক্রিয়া সম্পাদিত হয়। শ্রদ্ধাক্রিয়াদির পর ১৫৮৪ সালের প্রথম ভাগে এক পূর্ণিমায় তীথিতে ব্যাপক জাকজমক সহকারে প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়। রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে আগত আমন্ত্রিত নৃপতিদের সাথে আলোচনা করে প্রতাপাদিত্য মুঘল বিরোধী জোট গঠনের চেষ্ঠা করেন। তার চেষ্টা সফল হয়নি বলে মনে হয়।
বিক্রমাদিত্যের জীবদ্দশায় তার ও ভ্রাতা বসন্তরায়ের ভিতর যশোহর রাজ্যে ভাগাভাগি হয়। রাজ্যের পূর্ব-অংশ ১০ (দশ) আনা পেলেন প্রতাপাদিত্য এবং পশ্চিম-অংশ ৬ (ছয়) আনা পেলেন বসন্ত রায়। রাজ্যের একেবারে পূর্বে চকশ্রী পরগনায় বসন্ত রায়ের শ^শুর কৃষ্ণরায় দত্ত ভূসম্পত্তিলাভ করে রাঙ্গদিয়ায় বসবাস করেন। সে কারণে চকশ্রী প্রতাপের অংশের ভিতর হলেও তার উপর প্রতাপের কর্তৃত্ব ছিল না। কিন্তু প্রতাপের রাজ্যের পূর্বসীমানার নিরাপত্তা রক্ষার জন্যও চকশ্রীতে নৌদূর্গ নির্মানের প্রয়োজন ছিল। সে কারণে প্রতাপাদিত্য অন্য স্থানের বিনিময়ে হলেও চকশ্রৗ দাবী করেন। কিন্তু সন্তান ও শ্যালকদের ঘোর আপতিতে বসন্ত রায় চকশ্রী প্রদানে অসম্মতি জানালেন। প্রতাপ খুল্লতাতকে হত্যার সুযোগ খুঁজতে থাকে। সুযোগও এসে যায়। খুল্লতাতোর পিতৃ শ্রদ্ধার তিথি উপস্থিত হলে তিনি তা পালনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। অনুষ্ঠানে প্রতাপকে রায়গড় দূর্গে নিমন্ত্রন করা হলো। কিন্তু অন্যান্য বারের ন্যায় এবার তিনি খালি হাতে এলেন না। বাছাইকরা কিছু সৈন্যসহ সসস্ত্র যোদ্ধাবেশে রায়গড় দূর্গে প্রবেশ করলেন। আতুড়ঘর থেকে শুরু করে রাজ্যভার গ্রহণ পর্যন্ত পিতৃ-মাতৃ স্নেহে লালন-পালনকারী খুল্লতাত বসন্ত রায় ও তার জেষ্ঠা পত্নীর বিশ্বাস ছিল তাদের অন্তরে বড় ধরনের আঘাত লাগে এমন কাজ প্রতাপাদিত্য কখনও করবেনা। তাদের সেই বিশ^াস ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায় তখন, যখন পিতৃশ্রাদ্ধ পালনরত পৌঢ় বসন্ত রায়কে শিরোচ্ছেদ করে পিতৃ-মাতৃ স্নেহের প্রতিদান দেয় প্রতাপ। খুল্লতাতো ছাড়াও তার দুইপুত্র গোবিন্দ ও চন্দ্র এবং গোবিন্দের গর্ভবতী স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করেন প্রতাপাদিত্য । চকশ্রী প্রতাপাদিত্যের হস্তগত হয়।
ইতিমধ্যে প্রতাপাদিত্য মুঘলদের বিরুদ্ধাচারণ শুরু করেন। আরাকান রাজের সংগেও তার সম্পর্ক ভাল ছিল না। মুঘলদের সংগে ছলনা করা সহজ হবে না বিবেচনা করে প্রতাপ আরাকান রাজের সাথে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। আরাকান রাজের বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য আরাকান রাজের শত্রু পর্টুগীজ সেনাপতি কার্ভালোকে ডেকে এনে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে তাকে হত্যা করেন। কার্ভালোর ছিন্ন মস্তক আরাকান রাজের নিকট পাঠিয়ে আরাকান রাজের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন। ১৫৯৯ খৃষ্ঠাব্দে প্রতাপাদিত্য স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। এই সংবাদ সম্রাট আকবরের নিকট পৌছালে স¤্রাট তাকে দমন করার জন্য রাজা মান্সিংহকে দায়িত্ব প্রদান করেন। ১৬০৬ খৃষ্ঠাব্দে সেনাপতি মানসিংহ সসৈন্যে বাংলায় আসেন এবং প্রতাপের রাজ্য আক্রমণ করেন। বসন্তপুর হতে ধূমঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ চলে। তিন দিন যুদ্ধের পর প্রতাপাদিত্য পরাজিত হয়ে সন্ধি প্রার্থনা করেন। সন্ধির শর্তানুসারে মুঘল স¤্রাটের বিরুদ্ধে কখনও বিরুদ্ধাচারণ না করার ও স্বাধীনতার সকল চিহ্ন মুছিয়া ফেলার শর্তে প্রতিঞ্জা করে নিজ রাজ্যে ফিরে পেলেন। কচুরায়ও তার পিতার প্রাপ্ত অংশ ফিরে পেলেন। এই যুদ্ধে যে সকল মুঘল সৈনিক মারা যান তাদের বংশীপুর(টেঙ্গা)মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। এই যুদ্ধে স্বজাতীয় সেনাপতি মান্সিংহের কৃপাবলে গুরুপাপে লঘুদণ্ড পেলেন। যুদ্ধে নিহত ওমরাহ মাহমুদের নামানুসারে মামুদপুর গ্রামের নাম রাখা হয়। প্রতাপাদিতকে দমন করে মানসিংহ রাজমহলে ফিরে যান। অভিযান শেষে মান্সিংহের সংগে আসা সৈন্যদের ভিতর কেও কেও সুন্দর স্থান ও স্বচ্ছন্দ জীবিকার ভরসায় বর্তমান যশোর-খুলনার বিভিন্ন স্থানে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এদেশের বাসিন্দা হয়ে যান। যশোর শহরের খড়কিতে বসবাসরত পীরবংশীয়রা তাদেরই অংশ।
সম্রাট আকবারের মৃত্যুর পর পুত্র সেলিম জাহাঙ্গীর নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি সমগ্র বাংলাকে মুঘল শাসনাধীনে আনার সংকল্প করে ইসলাম খাঁ কে বাংলার সুবেদার করে পাঠান। ১৬০৮ খৃস্টাব্দে ইসলাম খান রাজমহলে পৌছিলে প্রতাপাদিত্য তার বালকপুত্র সংগ্রামাদিত্যের নিকট কয়েকটি হাতী ও কিছু মূল্যবান উপহারসহ সুবেদারের নিকট পাঠান। এ ছাড়াও প্রয়োজনে নিজে সাক্ষাত করার প্রতিশ্রুতি লিখে পাঠান। জবাবে নবাব ইসলাম খাঁ প্রতাপ পুত্রকে সমাদর করেন এবং বিদায়ের সময় প্রতাপাদিত্যকে সাক্ষাতের নির্দেশ দিয়ে পাঠান। অনুরুপ সংবাদ ভূষণার জমিদার মুকুন্দ রায়কেও পাঠান। নবাব দীর্ঘ অপেক্ষার পরও যখন প্রতাপাদিত্য ও মুকুন্দরাম সাক্ষাৎ করলেন না। তখন নবাবের নির্দেশে মুঘল বাহিনী কুচ করে ফতেপুর পৌছান এবং সেখানে আরও একমাস অপেক্ষা করেন। এ সময় ভূষনার জমিদার মুকুন্দ রায় নিজ পুত্রসহ ১৮ টি হাতী ও বহু উপহার সামগ্রিসহ নবাবের সংগে সাক্ষাৎ করেন। অনুরুপ যশোহরের প্রতাপাদিত্য পঞ্চাশ হাজার টাকা, ৬টি হাতী ও বহু মূল্যবান উপহারসহ বজ্রপুরে নবাবের সাথে সাক্ষাৎ করলে নবাব তাকে যথেষ্ট সমাদর করেন। বিদায়ের পূর্বে মুছা খাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৫০০ রণপোত, ১ হাজার অশ্বারোহী , ২০ হাজার পদাতিক সৈন্য সহায়তা দিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতি আদায় করে বিভিন্ন উপহার ও খেলাৎ দিয়ে নবাব তাদের স্বদেশে ফিরে গিয়ে প্রস্তুতি গ্রহনের নির্দেশ দেন।
যথা সময় সুবেদার নবাব ইসলাম খাঁ বিদ্রেহী ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে অভিাযান পরিচালনা করে সফলতা লাভ করেন। কিন্তু অভিযানের সময় নবাবকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতাপাদিত্য সহ্য়াতা পাঠাননি। তবে ভূষনার মুকুন্দরায় এবং তার পুত্র সুত্রাজিৎ মুঘল পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে। সকল যুদ্ধে মুঘলদের বিজয় দেখে প্রতপাদিত্য মুঘল রোসানাল থেকে বাঁচার জন্য ছলনার আশ্রায় নিয়ে ৮০ খানা রণপোতসহ পুত্র সংগ্রামাদিত্যকে ঘোড়াঘাটে পাঠিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু নবাব ইসলাম খাঁ তার ছলনাপূর্ণ প্রার্থনা প্রত্যাখান করে প্রতাপাদিত্য প্রেরিত ৮০ খানা রণপোত নৌ বাহিনীতে সংযুক্ত না করে মীর-ই ইমারত কে নির্মান সামগ্রী বহনের কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দেন।
সুবেদার ইসলাম খাঁ অনুভব করেন দূরবর্তী রাজমহল থেকে বঙ্গদেশ নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয়। তাই তিনি রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করে ঢাকার নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতাপ যথাসময়ে সৈন্য সহায়তা প্রেরণ না করায় নবাব ক্রোধান্বিত হন এবং ঘোড়াঘাট হতে ঢাকায় ফিরার পূর্বেই ইনায়েত খাঁকে প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার নির্দেশ দেন। এই যুদ্ধে এনায়েত খাঁর প্রধান সহকারী ছিলেন মির্জা নথন। ইনি নওয়ারা ও তোপ বিভাগের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। মুঘল বাহিনী উৎসবপূর্ণ পরিবেশে শিকার করতে করতে প্রতাপের রাজধানীর পথে অগ্রসর হতে থাকেন। প্রতাপ পুত্রের নিকট নবাবের ক্রোধের কথা জেনে বিচলিত হয়ে পড়েন। পূর্বে স্ব-জাতীয় মুঘল সেনাপতিদের মাধ্যমে তিনি যে সকল সুবিধা আদায় করেছেন তা এবার সম্ভব নয় ভেবে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করতে থাকেন। যুদ্ধের ফলাফলও কি হতে পারে তিনি এবং তার সেনাপতিগণ অনুমান করেছিলেন। প্রতাপের পরিকল্পনা ছিল যুদ্ধে মুঘল বাহিনীকে কিছুদিন ঠেকিয়ে রেখে সন্ধির মাধ্যমে নিজেকে ও তার রাজ্যকে রক্ষা করা।
প্রতাপাদিত্য মুঘল বাহিনী প্রতিরোধের জন্য তার সেনাবাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করে একভাগ রাজধানী রক্ষার জন্য নিজ নেতৃত্বে ধূমঘাটে অবস্থান করেন। অন্য ভাগ জেষ্ঠপুত্র উদায়াদিত্যের নেতৃত্বে সালখার মোহনায় বাঁধা দেওয়ার জন্য পাঠান। উদায়াদিত্যের সাথে তার প্রধান সহকারী খোঁজা কমল নৌ-সেনার অধিনায়ক এবং কতলু খাঁর পুত্র জামাল খাঁ অশ^ারোহি ও পদাতিক সৈন্যের দায়িত্ব গ্রহন করেন। মুঘল বাহিনী সালখাতে পৌছে অসংখ্য রণতরী ও উদয়ের দূর্গ নির্মানের সংবাদ পেয়ে নিজেদের যুদ্ধ কৌশল ঠিক করে নেন। সিদ্ধান্ত হয় ইছামতির দুই তীর দিয়ে স্থলবাহিনী অগ্রসর হবে। নৌ-বাহিনীও দুই ভাগে ভাগ হয়ে নদীর দুই তীর ঘেঁসে অগ্রসর হবে। ইছামতির পশ্চিম পাড়ের নেতৃত্ব দেবেন মির্জা নথন ও পূর্ব পাড়ের নেতৃত্বে থাকলেন সয়ং এনায়েত খাঁ। তোপ বাহিনীর সহায়তায় উভয় বাহিনী অগ্রসর হবে।
পূর্ব দিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরদিন মুঘল বাহিনীর কুচ আরম্ভ হলো। প্রথমে নৌ-যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতাপাদিত্যের সমর শক্তির প্রধান শক্তিই নৌশক্তি। এই বাহিনীর প্রধান দায়িত্বে ছিলেন কমল খোজা, প্রধান সেনাপতি ছিলেন যুবরাজ উদায়াদিত্য। যুদ্ধে কমল খোজা নিহত হলেন এবং উদায়াদিত্য পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। সালখার যুদ্ধ নৌ-যুদ্ধ হলেও মুঘলরা স্থলের গোলোন্দাজ ও তীরন্দাজের সহায়তায় তা সহজেই জয়লাভ করলো। পূর্ব থেকে শঙ্কিত প্রতাপ বাহিনীর এই পরাজয় সেনাদের মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে যায়। জামাল খাঁ হস্তি বাহিনী নিয়ে খাগড়াঘাটে মোগল পক্ষে যোগ দিলেন। খাগড়াঘাট (ধূমঘাট) যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর প্রবল আক্রমনে প্রতাপ বাহিনী টিকতে না পেরে ধূমঘাট দূর্গাভ্যন্তরে আশ্রয় লইলেন। যুদ্ধের পরিস্থিতি বিবেচনা করে পিতা-পুত্র আত্মসমার্পনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে প্রতাপাদিত্য তার দুইজন মন্ত্রীসহ নিজে এনায়েত খাঁর শিবিরে গিয়ে শিবিরের বাহিরে দাড়িয়ে সাক্ষাত প্রার্থনা করেন। এনায়েত খাঁ সন্ধির প্রস্তাবে প্রতাপাদিত্যকে সংগে নিয়ে ঢাকায় সুবেদার নবাব ইসলাম খাঁর সংগে সাক্ষাতের পর নবাবের মর্জি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে বলে প্রতাপকে জানান। প্রতাপও এনায়েতের কথায় রাজি হয়ে সন্ধির উদ্দেশ্যে এনায়েত খাঁর সংগে ঢাকায় রওনা হন।
যথা সময়ে এনায়েত খাঁ প্রতাপাদিত্যকে সংগে নিয়ে নবাব ইসলাম খাঁ’র সহিত সাক্ষাত করলেন। নবাব ইসলাম খাঁ প্রতাপের সন্ধির প্রস্তাবে রাজি হলেন না। তিনি প্রতাপকে বন্দী করলেন। নবাব বন্দি ও শৃঙ্খলিত প্রতাপকে লোহার খাঁচায় পুরে আগ্রায় স¤্রাটের দরবারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আগ্রায় নেওয়ার পথে ৫০ বছর বয়সি শৃঙ্খলিত প্রতাপ বারানাসি পৌছালে তার মৃত্যু হয়।প্রতাপের ঢাকা পৌছানোর পর যে পরিনতি হয়েছিল সে খবর রাজধানী ধূমঘাটে পৌছালে উদায়াদিত্য সেনাপতি মীর্জা নথনের সৈন্যদের উপর চড়াও হলে মুঘল সৈন্যদের হাতে তিনি নিহত হন। মুঘল সৈন্য কর্তৃক দূর্গ দখলের পূর্বে প্রতাপ মহিষী পরিবারের অন্যান্য নারী ও শিশু-সন্তানসহ যমুনা জলে আত্মবিসর্জন দেন। অতঃপর মুঘল বাহিনী ধূমঘাট দূর্গ দখল করে ধূলিসাৎ করে দেয়। নবাব যশোহর প্রদেশ বাদশাহী রাজ্যভূক্ত করলেন। এনায়েত খাঁকে যশোর রাজ্যের প্রথম শাসনকর্তা তথা ফৌজদার নিয়োগ করেন এবং বাদশাহী দেওয়ান পাঠালেন প্রজাকষ্ট না বাড়িয়ে কত খাজনা আদায় করা যায় তা নির্ধারনের জন্য। এনায়েত খাঁ টেঙ্গা মসজিদের সন্নিকটে নির্মিত প্রাসাদে বসবাস করতে থাকেন। বর্তমানে এই প্রাসাদটি হামামখানা বলে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত। এনায়েত খাঁ বসন্ত রায়ের পুত্র চন্দ্র শেখর রায় ওরপে চাঁদ রায়কে ধূমঘাট দূর্গে এসে বাস করার অনুমোতি দেন। সুন্দরবন অঞ্চলের আবহাওয়ায় এনায়েত খাঁর স্বাস্থ্য হানি ঘটে। ধারনা করা হয় এই সময় সুন্দরবন অঞ্চলে প্রকৃতিক বিপর্যয় ও ভূমি অবনমন ঘটে। সে কারণে এনায়েত খাঁ ও চাঁদ রায় ধূমঘাট পরিত্যাগ করেন।
এনায়েত খাঁ ও চাঁদ রায় ধূমঘাট এলাকা পরিত্যাগের পর ধূমঘাটের গুরুত্ত্ব ক্রমান্বয় কমতে থাকে। এই ভাবে বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় কর্তৃক আফগান ও মুঘলদের নিকট থেকে প্রাপ্ত ধনসম্পদ ও ক্ষমতার যে সিঁড়ি রচিত হয়েছিল ; প্রতাপাদিত্যের অযোগ্যতা, অনভিজ্ঞতা, অদূরদর্শিতা, ক্ষমতালিষ্পা,নিষ্ঠুরতা ও বিশ^াসঘাতকতার কারণে মাত্র ৩৪ বছরে সেই ক্ষুদ্র যশোহর রাজ্যের রায় রাজত্বের যবনিকা রচিত হলো। একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক উত্থান-পতন অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। একটি রাজ্যের প্রায় চার দশকের রাজধানীর কোন চিহ্নই ধূমঘাটে আজ আর অবশিষ্ঠ নেই। মুঘল আমলে বাংলার রাজধানী “ঐতিহাসিক ধূমঘাট এখন শুধুই স্মৃতি”।
সম্পাদক ও প্রকাশক: খান মাহাবুব হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: মিশারুল ইসলাম (মনির), বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২৬/১, ফারাজীপাড়া লেন, খুলনা। প্রকাশক কর্তৃক ফ্রেন্ডস প্রিন্টার্স, ১০৭, স্যার ইকবাল রোড থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বিজ্ঞাপন বিভাগ : ফোন : ০৪১-৭৩২৭০০, মোবা : ০১৭১১-৩৪৬৬৬২, ০১৭১১-০৬৫৭৫৬। 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥 : 𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, 𝐖𝐞𝐛 : 𝐰𝐰𝐰.daily𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧.𝐜𝐨𝐦
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত : dailysangjogprotidin.com