সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বুক পেতে নিয়ে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জানমালের ক্ষতি অনেক কমিয়ে দেয়, যার প্রমাণ প্রতিবারই দিয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনও এখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগের বিষয়। তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বনায়নের গাছ কেটে উপকূলীয় এলাকাকে ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়টি। স্থানীয় লোকজন বলছেন, যে বনায়ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে তাদের রক্ষা করছে, সেটিকে এখন কেটে উজাড় করে দিচ্ছে স্থানীয় সংঘবদ্ধ একদল লোক।
সুন্দরবনের মূল বনভূমি থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ও গাবুরা ইউনিয়নের দূরত্ব ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের মতো। সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় দুটি ইউনিয়নের লোকজন প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবারই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বলা যায়, তাদের রক্ষায় পদ্মপুকুর ও গাবুরার সংযোগস্থল চৌদ্দরশি সেতুর পশ্চিমে খোলপেটুয়া নদীর তীরে ৩০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই উপকূলীয় এলাকার মানুষকে রক্ষা করে আসছিল এটি। এখন সেই বনায়নের গাছ কেটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। এসব গাছ কেটে নিলেও প্রশাসন ও বন বিভাগ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, দিনরাত সমানতালে করাত-কুড়াল দিয়ে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুই ইউনিয়নের সংঘবদ্ধ একাধিক গ্রুপের লোকজন। পাশাপাশি নদীর চরে বনাঞ্চলে যেখানে-সেখানে গর্ত খুঁড়ে মাছ শিকারের ফাঁদ পাতা হয়েছে। শিকারিরা তাদের সুবিধার্থে বনায়নের গাছ কেটে ফেলছেন। নদীতে জোয়ার এলে বনাঞ্চলের গর্তে পানি আটকে থাকায় সেখানে নতুন গাছ জন্মাতে পারছে না। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে বনায়ন। অথচ বছরের পর বছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও দুর্যোগে প্রাচীর হিসেবে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করে আসছিল এসব গাছ। এ বিষয়ে বারবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বন বিভাগকে জানানো হলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এখনও গাছ কাটা অব্যাহত থাকায় বনাঞ্চলটি ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
যে বনায়ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে তাদের রক্ষা করছে, সেটিকে এখন কেটে উজাড় করে দিচ্ছে স্থানীয় সংঘবদ্ধ একদল লোক
সরেজমিনে দেখা গেছে, বনের ছোট-বড় নানা প্রজাতির গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। গাছের গোড়া পড়ে আছে। ডালপালা ফেলে রাখা হয়েছে বনের ভেতরে। অসংখ্য গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে, যা জোয়ারের সময় পানিতে ভরে যায়। এসব গর্তে জোয়ারের সময় রেণুপোনা আসে। যা পরে ধরে বাজারে বিক্রি করেন জেলেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাবুরার ১ নম্বর ওয়ার্ডের খোলপেটুয়ার, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গাজীপাড়ার ও বনের কাছাকাছি বসবাসরত একাধিক পরিবারের লোকজন গাছগুলো কাটছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, খোলপেটুয়া নদীতে প্রায় ৭০০ বিঘাজুড়ে একটি চর জেগেছে। সেখানে প্রথমে স্থানীয় লোকজন বনায়ন শুরু করলেও পরবর্তীতে সুন্দরবন সংলগ্ন হওয়ায় নদীর জোয়ারে ভেসে আসা নানা গাছের বীজ চরে আটকে গাছগুলো জন্মায়। এতে নদীর প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গাজুড়ে বেড়িবাঁধ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। তবে সেই সবুজ বন এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
স্থানীয় একটি চক্র প্রথমে চরে যেখানে-সেখানে গর্ত খুঁড়ে মাছ শিকারের জন্য ফাঁদ তৈরির জন্য বনায়নের গাছ কাটা শুরু করেন। পরে পার্শ্ববর্তী গাবুরার কয়েকটি এলাকার লোকজন এই ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দেন। এভাবে গত ছয় মাসের মধ্যে হাজারো গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যা আজও চলমান আছে।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওহিদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আগে বনে প্রচুর গাছ ছিল। এখন প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। গাছ কাটার শব্দ যাতে লোকালয়ে না আসে, সেজন্য করাত দিয়ে কাটা হয়। আবার অনেক সময় গাছ কেটে রেখে যায়, দুই-এক দিন পর নিয়ে যায়। যাতে মানুষকে বোঝানো যায় গাছটা মারা গেছে, তাই মরা গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে।’
এসব গাছ কেটে নিলেও প্রশাসন ও বন বিভাগ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের
স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আলী নয়ন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ঘেঁষে প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা বনটি এখন ধ্বংসের পথে। নদী পাড়ের মানুষজন জ্বালানি কাঠ, ঘর তৈরির কাঠ আর আসবাবপত্রের জন্য গাছগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া মাছ শিকারিদের দৌরাত্ম্যে নতুন গাছ জন্মাচ্ছে না। এভাবে গাছ কাটা চলতে থাকলে বনের অস্তিত্ব থাকবে না। অথচ বছরের পর বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাচীর হিসেবে আমাদের উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করে আসছিল বনাঞ্চলের এসব গাছ।’
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা রেজাউল করিম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দিনের বেলায় এসে গাছ কেটে রেখে যায়, জোয়ারের সময় নৌকায় করে নিয়ে যায়। গাবুরা থেকেও নৌকায় করে এসে অনেকেই গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। নিষেধ করলেও শোনে না। আগে বন রক্ষায় একটা কমিটি ছিল, এখন আর নেই। সেই সুযোগে চলছে নির্বিচারে গাছ কাটা।’
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গাবুরার খোলপেটুয়া গ্রামের কিছু লোকজন, পদ্মপুকুরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পাতাখালি গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার ২৫-৩০ জন বাসিন্দা এবং বন সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত ১০-১৫টি পরিবার বন নিধনের কাজে জড়িত। পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজন মাদকসেবী টাকার জন্য বনের গাছ চুরি করে বিক্রি করে দিচ্ছে। আবার হরিনা চিংড়ির রেণু ধরার জন্য নির্ধারিত কিছু ব্যক্তি বনের মধ্যে গাছ কেটে শতাধিক গর্ত তৈরি করেছে। এর ফলে একদিকে ক্রমাগত পুরাতন গাছ নিধন হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন চারাগাছ জন্মানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে যারা এই বন দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন, তারাও ব্যক্তিস্বার্থে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই বন উজাড়ের কাজে জড়িত আছেন। এখন প্রশাসনিক ও পুলিশের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায় দ্রুত বিলীন হয়ে যাবে বনাঞ্চল, বিপর্যয়ে পড়বে উপকূল।’
দিনরাত সমানতালে করাত-কুড়াল দিয়ে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুই ইউনিয়নের সংঘবদ্ধ একাধিক গ্রুপের লোকজ
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী পরিচালক সোহানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বনের ভেতরে গর্ত করে মাছের পোনা ধরা আর নির্বিচারে গাছ কাটা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এতে নতুন করে গাছ জন্মায় না। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়। অথচ এসব সামাজিক বন উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। বনাঞ্চল ধ্বংস হলে পরিবেশের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘খোলপেটুয়া নদীর চরে গড়ে ওঠা বনায়নের গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনা দুঃখজনক। কিছু দুর্বৃত্ত চুরি করে এসব গাছ কেটে পাচার করছে। এ ঘটনায় জড়িতদের ধরার চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা গোপনে গাছ কাটায় ধরা যাচ্ছেনা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রনী খাতুন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বনায়নের গাছ কাটা বেআইনি। যারা এসব কাজ করছে তারা অপরাধী। স্থানীয় দুই চেয়ারম্যান ও সামাজিক বন বিভাগকে বিষয়টি জানিয়ে ব্যবস্থা নেবো। সেইসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওই বনাঞ্চল রক্ষার জন্য যা যা করার দরকার, ব্যবস্থা নিতে বলবো।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: খান মাহাবুব হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: মিশারুল ইসলাম (মনির), বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২৬/১, ফারাজীপাড়া লেন, খুলনা। প্রকাশক কর্তৃক ফ্রেন্ডস প্রিন্টার্স, ১০৭, স্যার ইকবাল রোড থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বিজ্ঞাপন বিভাগ : ফোন : ০৪১-৭৩২৭০০, মোবা : ০১৭১১-৩৪৬৬৬২, ০১৭১১-০৬৫৭৫৬। 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥 : 𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, 𝐖𝐞𝐛 : 𝐰𝐰𝐰.daily𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧.𝐜𝐨𝐦
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত : dailysangjogprotidin.com