সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ অভিঘাত ইতিমধ্যেই মানবজীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। বিশেষত নারী ও শিশুরা পড়েছেন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ, সুপেয় পানির সংকট, এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষা পর্যন্ত সবকিছুকে করে তুলেছে অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ সয়েল রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ১৯৭৩ সালে যেখানে ৮.৩ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি ছিল লবণাক্ততার আওতায়, ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫.৬ মিলিয়ন হেক্টরে। গত ৩৫ বছরে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এই লবণাক্ততা শুধু জমির নয় - মানুষের শরীরেও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS)-এর এক গবেষণায় বলা হয়, পশুর নদী অববাহিকার মানুষ দৈনিক ১৬ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। খুলনার দাকোপ উপজেলায় ২০০৯-১০ সালে করা এক জরিপে দেখা যায়, অতিরিক্ত নোনা পানি গ্রহণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের উচ্চ রক্তচাপ, জরায়ুর প্রদাহ, গর্ভপাত ও অপরিণত শিশুর জন্মের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ফেরদৌসি বেগম জানান, ‘‘লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। গর্ভকালীন সময়ে উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করছে।’’
আবহাওয়াবিদ ড. কালাম মল্লিক বলছেন, ‘‘নারীরা শরীর ঢেকে রাখেন বলে তাপপ্রবাহের প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ে। রান্নাঘরের ভেতরে অতিরিক্ত তাপ ও ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে।’’
তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শুধু দৈহিক কষ্টই নয়, নারীদের মৃত্যুঝুঁকিও বেড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী নিহত হওয়ার হারও বেশি। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের ৭৭ শতাংশ, ২০০৪ সালের সুনামিতে ৭০ শতাংশ এবং ২০০৯ সালের আইলায় ৭৩ শতাংশ নারী ছিলেন।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির জন্য নারীদের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার ৯৫.৫ শতাংশ নারীকে প্রতিদিন পানির জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে তারা চুলে, ত্বকে, এবং প্রজনন স্বাস্থ্যে নানা ক্ষতির সম্মুখীন হন।
ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম বলেন, ‘‘নারীরা পানির অভাবে কম পানি পান করেন, এতে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পশিয়া, গর্ভপাতসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’’
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। ইউনিসেফের মতে, বিশ্বে জলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রায় ২ কোটি শিশু জলবায়ু দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে নিয়মিত। পানিবাহিত রোগ, অপুষ্টি, মানসিক চাপ, শিক্ষায় ব্যাঘাত এবং বাস্তুচ্যুতি তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে। শিশুরা ঝরে পড়ছে শিক্ষা থেকে জড়িয়ে পড়ছে শিশুশ্রমে।
সেভ দ্য চিলড্রেন-এর পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘‘শিশুদের শিশুশ্রম থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবারকেই আগে সহযোগিতা করতে হয়। কারণ দরিদ্র পরিবারগুলো তাৎক্ষণিক আর্থিক পরিবর্তন না পেলে শিশুরাও প্রকল্পের সুবিধা নিতে পারে না।’’
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত জনিত দূরযোগের ফলে বাড়ছে বাল্যবিয়ের হার। বাল্যবিয়ের শিকার কিশোরীরা পুষ্টিহীনতা, প্রজনন জটিলতা এবং শিক্ষার সুযোগ হারানোর শিকার হচ্ছে।
ইউএনডিপির শারমিন ইসলাম বলেন, ‘‘এদের অনেকেই মাসিক ব্যবস্থাপনায় সচেতন না হয়ে নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাচ্ছে। এতে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে।’’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি এখন মানবাধিকার, স্বাস্থ্য এবং নারীর ক্ষমতায়নের ইস্যু। নারীর জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। শিশুদের জন্য জলবায়ু সহনশীল শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিকল্পনায় নারী ও শিশুদের কণ্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত করা, স্থানীয় অভিযোজন প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ত করা এবং পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তা জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি এখনকার বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন নারীরা, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুরা। এখনই যদি রাষ্ট্র ও সমাজ একযোগে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সময়টা আরো কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিস্টরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: খান মাহাবুব হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: মিশারুল ইসলাম (মনির), বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: ২৬/১, ফারাজীপাড়া লেন, খুলনা। প্রকাশক কর্তৃক ফ্রেন্ডস প্রিন্টার্স, ১০৭, স্যার ইকবাল রোড থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত। বার্তা ও বিজ্ঞাপন বিভাগ : ফোন : ০৪১-৭৩২৭০০, মোবা : ০১৭১১-৩৪৬৬৬২, ০১৭১১-০৬৫৭৫৬। 𝐄-𝐦𝐚𝐢𝐥 : 𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧@𝐠𝐦𝐚𝐢𝐥.𝐜𝐨𝐦, 𝐖𝐞𝐛 : 𝐰𝐰𝐰.daily𝐬𝐚𝐧𝐠𝐣𝐨𝐠𝐩𝐫𝐨𝐭𝐢𝐝𝐢𝐧.𝐜𝐨𝐦
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত : dailysangjogprotidin.com